হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ, ফের জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা
![]()
জার্নাল ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৃতীয় দিনে গড়ানোর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌ চলাচল ফিরবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে সোমবারই দাম বেড়েছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
এখন প্রতিব্যারেল ব্রেন্ট ফিউচারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ দশমিক ৯২ ডলারে, যা গত ১৫ জুনের পর সর্বোচ্চ।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার পর সংঘাত-পূর্ব পর্যায়ে নেমে এসেছিল তেলের দাম। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের দামের তুলনায় বর্তমানে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সোমবার জানিয়েছে, টানা তৃতীয় দিনের মতো ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ‘নিরীহ বেসামরিক মানুষ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা’ কমাতে এসব অভিযান চালানো হয়েছে।
এর পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী সুপারট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথাও জানিয়েছে তারা।
বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ পুনর্বহাল করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় শুরু করবে।
তেলের মজুত নিয়ে উদ্বেগ
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেল বাজার বিশ্লেষক জুন গোহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুতের মজুদ দ্রুত কমছে। ফলে বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, উভয় পক্ষের বক্তব্য ও সামরিক অবস্থান কিছুটা শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
কমেছে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তির আশা তৈরি হওয়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় আবারও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ৫৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের সপ্তাহের তুলনায় এ সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কম।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী প্রথম হামলার আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।
তেল বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি কনটেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন বলেন, হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল কার্যত থমকে যাচ্ছে। তার মতে, সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় যে তেল মজুত ব্যবহার করা হয়েছে, তার বড় অংশ ইতোমধ্যে কমে গেছে। ফলে নতুন করে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে বাজার আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তেল সরবরাহ সচল থাকবে
ইরান রোববার হরমুজ প্রণালি ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ’ রাখার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে তেল পরিবহন অব্যাহত থাকবে।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার আগের দিন সামরিক সহায়তায় ৮৫ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, এটি সাম্প্রতিক গড় প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তেল প্রবাহ অব্যাহত রাখবে।”
ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশঙ্কা
কানাডার টিডি সিকিউরিটিজের বৈশ্বিক পণ্য কৌশল বিভাগের প্রধান বার্ট মেলেক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পুনরায় তীব্র হওয়ায় তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, যদি বাস্তবিক সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছানো অসম্ভব নয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।