পরিকল্পনার অভাবে ভোলায় ৩০ বছর ধরে পড়ে আছে বিপুল গ্যাস

পরিকল্পনার অভাবে ভোলায় ৩০ বছর ধরে পড়ে আছে বিপুল গ্যাস

পরিকল্পনার অভাবে ভোলায় ৩০ বছর ধরে পড়ে আছে বিপুল গ্যাস
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

দ্বীপজেলা ভোলায় গ্যাসের প্রাচুর্য থাকার পরও সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাবে গত তিন দশকে গড়ে ওঠেনি কাঙ্ক্ষিত শিল্পকারখানা। এতে অলস পড়ে আছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস। এর মধ্যে সন্ধান মিলেছে নতুন আরও দুটি গ্যাসক্ষেত্রের।

চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষায় বসে আছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। এতে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভোলাবাসী, থমকে আছে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও। তবে সম্প্রতি ভোলায় শিল্পপার্ক স্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় নতুন করে গ্যাসভিত্তিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন দ্বীপবাসী। তারা বিগত দিনের মতো আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে এই ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়ন চান।

 অলস পড়ে আছে বিপুল গ্যাস 

তিন দশক আগে ১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার করে বাপেক্স। সেখানে মজুত আছে প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাস। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০০৯ সালে শুরু হয় সেই গ্যাসের বাণিজ্যিক উত্তোলন। বর্তমানে এই ক্ষেত্র থেকে দৈনিক উত্তোলন ক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট।
 
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির মাধ্যমে বোরহানউদ্দিনে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি শিল্পকারখানায় (শেলটেক সিরামিক লিমিটেড, কাজী ফিড, প্রিয় অটো, অ্যাডভান্স অটোব্রিকস, সাগর বেকারি, আল মদিনা ও জিকে ট্রেডার্স) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া ২ হাজার ৩৪৪টি আবাসিক সংযোগে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অন্যদিকে ইন্ট্রাকো সিএনজি আকারে ঢাকায় নিচ্ছে দৈনিক এক মিলিয়ন ঘনফুট। এরপরও প্রতিদিন উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
 
এছাড়া ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ ও ২০২৩ সালে ইলিশা-১ নামের আবিস্কৃত ক্ষেত্র দুটি থেকে এখনো গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি। গ্যাস সংযোগের জন্য বর্তমানে দুটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে। কাজ চলছে আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও প্রাণ-আরএফএলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের।
 
বাস্তবায়ন চান স্থানীয়রা
গ্যাসের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছেন ভোলাবাসী। সমাধান হচ্ছে না বেকার সমস্যার। বিগত সরকার সারকারখানা, ইপিজেড, এলএনজি স্টেশন ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস অন্যত্র নেয়ার পরিবর্তে ভোলাতেই ব্যয়সাশ্রয়ী শিল্পকারখানা করার দাবিতে দীর্ঘ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে ভোলাতেই ‘শিল্পপার্ক’ করার ঘোষণা দিলে হতাশা কেটে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। এছাড়া কম খরচে নৌপথে পণ্য পরিবহন ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎসহ শিল্পকারখানা স্থাপনে অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
 
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভোলা জেলা সভাপতি মো. সোলাইমান বলেন, ‘শিল্পকারখানা করার সকল পরিবেশ ভোলায় রয়েছে। বিগত দিনে বহু উদ্যোক্তা এসেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বাস্তবায়ন হয়নি। এর পেছনে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে।’
 
উন্নয়ন কর্মী মো. ইকরামুল আলম জানান, গত ১৭ বছর ধরে তারা শুধু ইকোনমিক জোন ও কলকারখানা হওয়ার আশ্বাস শুনেছেন। ঢাকা থেকে কর্মকর্তারা সরেজমিন দেখে গেলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন উদ্যোক্তারা যখন ভোলায় এসেছেন, তখন বিশেষ শ্রেণি সিন্ডিকেট করে জমির দাম বাড়িয়েছে, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফলে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে যেন এমন কোনো সিন্ডিকেট বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেটি কঠোর হাতে দমন করতে হবে।’
 
গণমাধ্যম কর্মী আবদুর রহমান হেলালের ভাষ্য, গ্যাসের পাশাপাশি ভোলায় বিদ্যুৎ ও নৌপথের সহজ যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকার ও বিরোধীদল এখানে শিল্পপার্ক স্থাপনের বিষয়ে একমত হয়েছে, তাই এর দ্রুত বাস্তবায়ন চান তিনি।
 
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম বলেন, ‘ভোলার উন্নয়নের পাঁচটি দাবির অন্যতম হলো গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন। যার মাধ্যমে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান দুটোই হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি শিল্পপার্ক স্থাপনের কাজ শুরুর দাবি জানান। এর মাধ্যমে গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব বলে জানান তিনি। এছাড়া উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন এই বিএনপি নেতা।
 
উদ্যোক্তাদের জন্য প্রস্তুত প্রশাসন
ভোলার গ্যাস খুলনা বা বরিশালে নিয়ে শিল্পায়ন করাকে বিপুল অর্থের অপচয় বলে মনে করেন ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর। তিনি বলেন, ‘গ্যাস শুধু বরিশাল পর্যন্ত নিতেই ১১শ কোটি টাকা খরচ হবে। এতো টাকা খরচ না করে ভোলাকেই শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে ভোলার মানুষের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষ উপকৃত হবেন। নৌপথের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সারকারখানা, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, ইপিজেড ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গ্যাসভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে এখানে।’
 
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম খান বলেন, ‘সম্পদের তুলনায় ভোলা উন্নয়নের সূচকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভোলার গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর উত্তোলন শুরু হলেও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পপার্কের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।’
 
এদিকে শিল্পকারখানা স্থাপনে সরকারের নির্দেশনা পালনে সব ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ডা. শামিম রহমান। তিনি বলেন, ‘গ্যাসভিত্তিক উন্নয়ন ভোলাবাসীর প্রাণের দাবি। স্থানীয় প্রশাসন জমি বরাদ্দসহ যা যা প্রয়োজন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখানে ছোট ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি ভারী ইন্ডাস্ট্রি করার সুযোগ রয়েছে।’ এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
 
এখানকার গ্যাস শুধু উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকার দ্রুত শিল্পপার্ক গড়ে তুলবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে; এমনটাই প্রত্যাশা ভোলার ২০ লাখ মানুষের।
  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed