নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস আজ, কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় নি

নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস আজ, কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় নি

নানিয়ারচর গণহত্যা দিবস আজ, কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় নি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আজ ১৭ নভেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি কালো দিন। ১৯৯৩ সালের এই কালো দিনে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বাঙ্গালীদের উপর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী তথা আজকের জেএসএস সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা পরিচালনা করে। এই গণহত্যার ৩২ বছর আজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে নানিয়ারচর গণহত্যাটি ১৯তম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

এই গণহত্যাকে পার্বত্য বাঙ্গালীরা ভুলে গেছে। এইভাবেই ৩২টি বছর কেটে গেছে। এই গণহত্যায় ৪৯ জনের অধিক নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়। বাঙ্গালী মা-বোনদের জেএসএস সন্ত্রাসীরা গণধর্ষণ করে হত্যা করে। আহত হয় প্রায় ১৫০/২০০ জন।

কী ঘটেছিলো সেই দিন?

সন্তুর জেএসএস সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য বাঙ্গালীকে নিধন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী শূন্য করবে এবং পাহাড়কে সন্ত্রাসে পরিণত করে রাজত্ব কায়েম করবে। তারা সেই স্বপ্ন নিয়ে বাঙ্গালী গণহত্যায় মেতে উঠেছিল সেসময়৷ এই গণহত্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৫ হাজার বাঙ্গালী নিহত হয়। এরা সবাই নিরস্ত্র বাঙ্গালী ছিল।

গণহত্যার পর নানিয়ারচর থেকে প্রায় ২১৮ পরিবার সমতলে ভয়ে ফিরে যান। সেদিন রাস্ট্র-প্রশাসন তাদেরকে নিরাপদ দিতে ব্যর্থ হয়৷ সন্ত্রাসে পরিণত হয় সমগ্র নানিয়ারচর সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম। বাঙ্গালীরা প্রাণের ভয়ে দিগদিগন্তে ছুঁড়তে থাকে। সেইদিনের লোমহর্ষক ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়।

সেদিন ছিল সাপ্তাহিক হাটবাজারের দিন, বুধবার (১৭ নভেম্বর)। তাই স্বভাবিকভাবে দুর-দূরান্ত থেকে বাজারে এসেছিল শত শত বাঙালী, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। সকালের দিকে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার আহমেদ মিয়া ও বুড়িঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফসহ পার্বত্য গণপরিষদের ব্যানারে একটি মিছিল স্থানীয় লাইবেরী প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় যাদের প্রধান দাবীগুলো ছিল: শান্তিবাহিনীর হাত থেকে নানিয়ারচরের নিরীহ বাঙালীদের বাঁচাও, লঞ্চঘাটের যাত্রী ছাউনি দিতে হবে ও সেনাবাহিনীর ৪০ ইবি রেজিমেন্টের সেনাছাউনি স্থাপন করতে হবে।

কয়েক হাজার বাঙালী ছাত্র-জনতার মিচ্ছিলে তখন সারা নানিয়ারচর উজ্জীবিত। মিচ্ছিল থেকে গনতন্ত্র ও সাংবিধানিক অধিকারের দাবী উচ্চকন্ঠে জানানো হচ্ছিল। মিচ্ছিলটি শান্তিপুর্ণভাবে শহরের রাস্তা প্রদক্ষিন শেষে কৃষি ব্যাংক এর সামনে সমাবেশ করে।

মিছিল প্রতিহত করার জন্য হামলা করে বেতছড়ি, ছয়কুড়িবিল, মাইচ্ছড়ি, গবছড়ি, তৈচাকমা, যাদুকাছড়া, বগাছড়ি, বড়াদম, বুড়িঘাট, কাঁঠালতলী, শৈলেশ্বরী, নানাক্রুম, সাবেক্ষ্যং, এগারাল্যাছড়া, বাকছড়ি, কেঙ্গালছড়ি থেকে আগত উগ্র উপজাতিরা শান্তিবাহিনীর নেতৃত্বে হামলা করে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি।

ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়, সন্তু লারমা নিজেই এই গণহত্যার নেতৃত্ব দেন। সন্তু লারমা, ফনি ভূষণ চাকমা, শোভাপূর্ণ চাকমা ও বীরেন্দ্র চাকমা নেতৃত্বে ৭৭ জন জেএসএস সন্ত্রাসী গণহত্যায় অংশ নেন। সন্তু লারমার বাড়ি ছিল এই নানিয়ারচর উপজেলায়। সন্তু নিজেই ১৩ মাসের নুর কায়েদা নামের এক মেয়ে শিশুকে পিষে হত্যা করে এবং তার মাকে ধর্ষণ করে যৌনাঙ্গে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

আহত বাঙালীদেরকে আহত অবস্থায়ই কাপুরুষেরা অনেক পশুর মত জবাই করে হত্যা করেছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে সেদিন বাঙালীরা কাপ্তাই লেকের পানিতে ঝাঁপ দিলেও জনসংহতি সমিতির শান্তিবাহিনী ও উগ্র পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক হায়নার নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। যারা দোকানে, বাড়িতে লুকিয়ে ছিল তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে বের করে হত্যা করা হয়েছে অথবা পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পাশের বাঙালীদের গ্রামগুলি লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই সময় রাঙ্গামাটি থেকে আসা লঞ্চ পৌঁছালে সেখানেও হামলা করে অনেক নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে হতাহত করা হয়। আনিসুজ্জামান নামক এক মৌলভীকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। এভাবে প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় বাঙালীদের উপর।

১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর গণহত্যাটি ঘটনার মাধ্যমে কয়েক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে ৪৯ জনের অধিক নারী, শিশু, আবাল বৃদ্ধ বনিতা নিরস্ত্র নিরীহ বাঙ্গালীকে হত্যা করে, অধিকাংশ লাশগুলোকে গুম করা হয়েছে এবং আহত করা হয়েছে আরও শতাধিকের অধিক, অপহরণ করা হয়েছে আরো শত শত বাঙ্গালীকে। ২০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণ ভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল বাঙালীদের ১শ ৩২টি ঘর বাড়ি। গৃহহীন হয়েছেন প্রায় শহস্রাধীক পরিবার। এরা লাশগুলোকে গুম করে আত্মীয়-স্বজনকে ফেরত না দিয়ে বা কবর দেয়ার সুযোগ না দিয়ে একত্রে পুড়িয়ে ফেলে মুসলিম ধর্মীয় রীতিকে অবমাননা করে।

বাঙ্গালী লেখক না থাকায় এসব নৃশংস গণহত্যা ও বর্বরোচিত ঘটনাগুলো বরাবরের মত ইতিহাস থেকে মুছে গিয়েছে। তৎকালীন গণমাধ্যম জেএসএস সন্ত্রাসীদের ভয়ে সত্য প্রকাশ করতো না। এমনকি তাদের পাহাড়ে প্রবেশে ছিলো কঠোর সেন্সর আরোপ।

তবে, নানা প্রতিকূলতা ভেদ করে এ খবর দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল।

সুরুজ মিয়া (৮১) ইসলামপুর, ফয়জ আলী (৭৯) বেতছড়ি ও আনোয়ার মোল্লা (৮৪) তারা নানিয়ারচর গণহত্যার পরের দিন মৃত্যুর ভয়ে এলাকা ছেড়ে ময়মনসিংহ ভালুকা চলে যান। তারা সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। নৃশংস গণহত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার তারা জ্ঞান হারিয়েছেন। তারা বাঙ্গালী গণহত্যার বিচার চেয়েছেন এবং নিহতদের পরিবারগুলোর সদস্যদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *