খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

সম্প্রতি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মারমা কিশোরীর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল, অগ্নিসংযোগ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরের জেলা খাগড়াছড়ি। আন্দোলনের নামে টানা পাঁচ দিনের তাণ্ডব চলে জেলা সদর এবং গুইমারা উপজেলায়। এতে সেনাবাহিনীর ১৪ জন এবং পুলিশের ৪ সদস্যসহ আহত হওয়া ছাড়াও বেসামরিক আরো বেশ কয়েকজন হতাহত হন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের প্রস্তুত করা প্রতিবেদন মতে, এ ঘটনায় বেসামরিকদের মধ্যে ৩ জন (উপজাতি) নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে সদরে ৭ জন (৬ জন বাঙালি এবং একজন উপজাতি) এবং গুইমারায় ১৩ জন (উপজাতি)। আগুন ও ভাংচুরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাগড়াছড়ি সদরে ২৮ (বাঙালি ২৭, উপজাতি ১) এবং গুইমারায় ৯৭ ব্যক্তি/পরিবার (এর মধ্যে বাঙালি ১৯ এবং উপজাতি ৭৮)। এছাড়াও খাগড়াছড়ি সদরে বাঙালিদের ১টি মোটরসাইকেল, ২টি টমটম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে গুইমারায় ১টি ট্রাক, ১টি মাহিন্দ্র এবং ৪১টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৪৩টি যানবাহন পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে; এর মধ্যে বাঙালিদের ৭টি, উপজাতীয়দের ২৬টি এবং মালিক অজ্ঞাত ১০টির। জেলা প্রশাসনের হিসাব মতে, এ ঘটনায় জেলা সদরের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য ৭৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং গুইমারায় এর পরিমাণ ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তবে বিচারের দাবিতে আন্দোলনের নামে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিল সেটার মূল্য কোনোভাবে টাকার অঙ্কে হিসাব করা যাবে না।

ঘটনার সূত্রপাত

খাগড়াছড়ি সদরের সিঙ্গিনালা এলাকার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মারমা কিশোরী ২৩ সেপ্টেম্বর প্রাইভেট পড়ে রাত ৯টায় বাসায় ফেরার কথা থাকলেও সে ফিরে আসেনি। তার বাবা শিক্ষিকার বাসায় খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন, মেয়েটি প্রতিদিনের মতো ৯টার সময়ই বাসার উদ্দেশে চলে গেছে। মেয়েকে না পেয়ে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীসহ খুঁজতে থাকেন। রাত ১১টার দিকে শিক্ষিকার বাড়ি থেকে আনুমানিক ১৫০ ফুট দূরে ধানক্ষেতে হাঁটুসমান কাদা-পানিতে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। সেখান থেকে তুলে কাছের একটি দোকানে এনে চোখে-মুখে পানি ছিটা দিলে জ্ঞান ফিরে তার। একপর্যায়ে মেয়েটির অজ্ঞান হওয়ার পূর্বের বর্ণনা শুনে এবং পারিপার্শ্বিক ঘটনা দেখে পরিবার ও অন্যান্যরা নিশ্চিত হন যে কিশোরীটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাই রাতেই তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, অপরদিকে কিশোরীর পিতা বাদী হয়ে ভোর রাতে সদর থানায় অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে একটি জিডি করেন। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে পরের দিন ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে সিঙ্গিনালা এলাকার বাপ্পী শীলের ছোট ছেলে শয়ন শীলকে (১৯) সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় আটক করে পুলিশ। পরে তাকে আদালতে সোপর্দ করলে, পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অপরদিকে বাঙালি কর্তৃক মারমা কিশোরী সংঘবদ্ধ ধর্ষিত হওয়ার অভিযোগ এনে এর বিচার ও শাস্তির দাবিতে ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা শহরের শাপলা চত্বরে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উক্যানু মারমার নেতৃত্বে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন বেলা আড়াইটা থেকে পৌনে ৪টা পর্যন্ত জেলা সদরের স্বনির্ভর বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল) দল সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য নারী সংঘের যৌথ উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল হয়। এদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে ফেসবুকে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ নামে একটি পেজ খুলে সেখানে উক্যানু মারমার নেতৃত্বে ২৫ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়। ২৬ তারিখের কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য উক্যানু মারমাকে সেনাবাহিনীর সদর জোনে আসার অনুরোধ জানালেও তিনি সাড়া দেননি। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি টিম তাকে ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে মধুপুর বাজার থেকে নিয়ে এসে প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয়। পরের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গী স্কয়ারে তাদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ‘পাহাড় থেকে সেনা হঠাও’, ‘বাঙালিদের সমতলে ফিরিয়ে নাও’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয়। অন্যদিকে উক্যানু মারমা বক্তব্যে তাকে জোরপূর্বক তোলে নেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানান। সমাবেশ চলাকালে সাড়ে ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ সমাবেশস্থল অতিক্রম করার সময় আন্দোলনকারীরা পিকআপটিতে হামলা চালায়, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে ৪ জন সেনাসদস্য আহত হন এবং গাড়িটিও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এছাড়াও তারা ১টি অটো রিকশা ভাঙচুর করে। অপরদিকে সমাবেশ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের ডাক দেয়া হয়।

পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ শুরু যেভাবে

২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ (মূল) সমর্থিত জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে কথিত ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচি চলাকালে দুপুর পৌনে ১টার দিকে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে একজন বাঙালি মোটরসাইকেল চালক শহরের স্বনির্ভর বাজার থেকে শাপলা চত্বরে আসার পথে ইউপিডিএফের পিকেটাররা তার গতিরোধ করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়। এছাড়াও সদর উপজেলা পরিষদের পাশের একটি দোকানে অপেক্ষমান ৩/৪ জন বাঙালি ছেলেকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনা জানাজানি হলে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশকিছু বিক্ষুব্ধ বাঙালি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদ এলাকায় জড়ো হয়। একপর্যায়ে ইউপিডিএফ সমর্থিত পিকেটারদের সাথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এসময় অবরোধকারী পাহাড়িদের পক্ষ থেকে ব্যাপক ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও গুলতি দিয়ে আক্রমণ করা হয়। পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ৩০/৩২ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে এবং পুলিশ সদস্যরা ৪০/৪৫ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ফায়ার করে। এর মধ্যেও ইউপিডিএফ (মূল) সমর্থিত অবরোধকারীরা উপজেলা পরিষদ মসজিদের জানালার গ্লাস, একটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি মোটরসাইকেল, স্বনির্ভর বাজারে বাঙালিদের ২০/২২টি দোকান ভাংচুর, লুট ও একটি অটোরিক্সা ভাংচুর করে। অপরদিকে বাঙালিরা মহাজন পাড়ায় উপজাতিদের কয়েকটি দোকান ভাংচুর ও একটি বাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে জেলা প্রশাসন বেলা ২টা থেকে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, সদর উপজেলা এবং গুইমারা উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে।

১৪৪ ধারা জারির পর আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ শেষে জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে পুনরায় ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিটি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ইউপিডিএফের চাপে রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে আরেকটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বহাল রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। এর ১০ মিনিট পর অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় জেলা সদরের য়ংড বৌদ্ধ বিহারে নাশকতার জন্য বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন রুখই চৌধুরী পাড়ায় ৩ জন উপজাতি যুবক ধারালো ছুড়ি, লাঠি, চাইনিজ কাটারি নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। বিষয়টি জানতে পেরে নাশকতার আশঙ্কায় স্থানীয় কয়েকজন বাঙালি যুবক এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় তাদেরকে আটক করে খাগড়াছড়ি সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টায় তাদেরকে খাগড়াছড়ি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদেরকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেন।

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

খাগড়াছড়িতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার উপস্থিতিতে খাগড়াছড়ির সকল সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সাথে সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক চলাকালে বেলা ১১টার দিকে গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল) সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সদস্যরা খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কে গাছের গুড়ি ও টায়ারে আগুন লাগিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এ সংবাদ পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (সেনাবাহিনী ও পুলিশ) সদস্যরা সেখানে পৌঁছে তাদের সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। এতে তারা উত্তেজিত হয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। একপর্যায়ে অবরোধকারীরা বাঙালিদের দোকান-ঘর ভাংচুর শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে বাঙালিরা তাদের জান-মাল রক্ষায় এগিয়ে এলে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ ও ১৫/২০ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার করে। এ সময় পাহাড়ি ও বাঙালিদের ৫০/৫৫টি দোকান, ৭/৯টি বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং বাঙালিদের ১টি হলুদের মিলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে বাঙালিরা সংঘবদ্ধ হয়ে ইউপিডিএফ (মূল) সমর্থিত অবরোধকারী পাহাড়িদের ধাওয়া করে। অবরোধকারীরা পিছু হটার সময় পাহাড়ের উপর থেকে সশস্ত্র ইউপিডিএফ (মূল) সদস্যরা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করে। এতে সেনাবাহিনীর ১০ জন সদস্য, পুলিশের ৪ জন সদস্য ও উপজাতি ১৩ জন ব্যক্তি আহত এবং ৩ জন উপজাতি নিহত হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক ৪টি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন এবং ৩টি মৃতদেহ ও আহতদের উদ্ধার করে বিকেল ৫টার দিকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

হতাহতদের খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আহত ১০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে ১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে প্রেরণ করেন। অপর ৯ জনকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। নিহতদের মরদেহ খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে হিমাগারে রাখা হয়। পরের দিন ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষে ১০টার দিকে পরিবারের সদস্যদের নিকট মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সহায়তায় পরিবারের সদস্যরা নিহতদের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় পারিবারিক শ্মশানে নিয়ে যান এবং ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় জনগণ কর্তৃক দাহ কার্য সম্পাদন করা হয়। পরবর্তীতে সদর হাসপাতালে ভর্তি আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়।

শান্তির উদ্যোগ

এ পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি জেলায় চলমান অবরোধ ও সহিংসতা রোধকল্পে আলোচনার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইউপিডিএফ (মূল) এর খাগড়াছড়ি সদরের সংগঠক ও মুখপাত্র অংগ্য মারমার সাথে যোগাযোগ করে। অংগ্য মারমা নিজে না এসে প্রতিনিধির মাধ্যমে আলোচনায় বসার জন্য সম্মত হন। তার দেয়া সময় অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত জেলা সার্কিট হাউজে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সভাপতিত্বে জুম্ম ছাত্র-জনতার ৬ জন (বাগিস চাকমা, ছদক চাকমা, কৃপায়ন ত্রিপুরা, পিন্টু তালুকদার, তোশিতা চাকমা ও মানিক চাকমা) প্রতিনিধির সাথে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় অন্যান্যদের মধ্যে ডিজিএফআই ডেট কমান্ডার, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা উপস্থিত ছিলেন।

পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

২৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। অপরদিকে ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে সিঙ্গিনালা এলাকায় যে মারমা কিশোরীর ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা থেকে এতকিছু ঘটে গেল ৩০ সেপ্টেম্বর সেই কিশোরীর ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফল সামনে আসে। তাতে দেখা যায়, খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জয়া চাকমার নেতৃত্বে ডা. মোশারফ হোসেন ও ডা. নাহিদা আকতারের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড কিশোরীর দেহে ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি। ২৮ সেপ্টেম্বর চিকিৎসকদের স্বাক্ষরিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার ১০টি সূচকের সব কটিতে স্বাভাবিক লেখা রয়েছে। আরো জানা যায়, মেডিক্যাল রিপোর্টের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা আপত্তি থাকলে পুলিশের পক্ষ থেকে ভিকটিমের পিতা ও মামলার বাদীকে উচ্চতর পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে বলা হলেও তিনি রাজি হননি। এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি নিজে থেকে মেয়ের বাবাকে বলেছি, খাগড়াছড়ি হাসপাতালের মেডিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে উন্নত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। ঘটনার ১৮ দিনের মধ্যে সেখানে ধর্ষণের আলামত শনাক্ত করা যায়। সেখানে যেতে চাইলে আমি সহযোগিতা করব। কিন্তু কেন জানি মামলার বাদী ওই মেয়েটির পিতা তাতে রাজি হননি।’

ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত না পাওয়া এবং সেই রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ থাকলে উচ্চতর পরীক্ষার ব্যাপারে রাজি না হওয়ার কারণ খুঁজতে পার্বত্য দর্পণ ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে অনুসন্ধান চালায়। পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়ির সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় যেখানে ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে মারমা কিশোরীটি ধর্ষিত হয়েছে বলে প্রচারিত হয়েছে তার আশেপাশে কোনো বাঙালি বাড়ি নেই। বিকেল ৫টার পর থেকে সাধারণত কোনো বাঙালি ওই এলাকা দিয়ে চলাচলও করে না। কিশোরীর বাড়ি থেকে তার প্রাইভেট শিক্ষিকার বাড়ি বড়জোর ৩০০ ফুট দূরে অবস্থিত। শিক্ষিকার বাড়ি থেকে ৩০/৩২ ফুট দূরে মারমাদের দুটি দোকান আছে। মেয়েটি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শিক্ষিকার বাসায় প্রাইভেট পড়ে। প্রাইভেট শেষে প্রতিদিন মেয়েকে বাসায় নিয়ে যেতে তার পিতা ওই দোকানে অপেক্ষা করেন। ঘটনার দিনও তিনি মেয়ের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সাড়ে ৯টা বেজে গেলেও মেয়েকে প্রাইভেট থেকে বের হতে না দেখে শিক্ষিকার বাসায় খুঁজতে যান। তিনি গিয়ে জানতে পারেন, মেয়ে ৯টার সময়ই চলে গেছে। এরপর থেকেই খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে শিক্ষিকার বাসা থেকে আনুমানিক ১৫০ ফুট দূরে ঢোল কলমীর ঝোপ পেরিয়ে ধান ক্ষেতে হাঁটুসমান কাদাপানিতে মেয়েকে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। সেখান থেকে মেয়েকে পাশের চায়ের দোকানে এনে চোখেমুখে পানি দিলে তার জ্ঞান ফিরে আসে। তখন সে জানায়, শিক্ষিকার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কেউ তার পেছন থেকে একটি ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারে। তখন সে পিছন দিকে তাকালে তাকে ঝাপটে ধরে কিছু একটা দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর থেকে তার আর কিছু মনে নেই।

মেয়েকে খুঁজে পাওয়ার পর রাত ১০টা ৪৩ মিনিটের দিকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের বাঙালি এলাকার বাসিন্দা মো. খোরশেদকে ফোন করেন সিঙ্গিনালা মারমা পাড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় মেংমাঅং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবাই মারমা। তিনি খোরশেদকে মেয়েটির নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে তার কাছে জানতে চান, এদিকে কোনো বাঙালি ছেলে আসছিল কিনা? খোরশেদ বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান এবং একই সঙ্গে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা যদি ঘটেই থাকে, তাহলে সেটা যে কোনো বাঙালি ছেলেই করেছে, সেব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে সন্দেহ করা ঠিক হচ্ছে কিনা? এটা বলে খোরশেদ আবাই মারমাকে ঘটনার ব্যাপারে সবাই মিলে ভালো করে খোঁজখবর নিতে বলেন। রাত ১১টা ১৩ মিনিটের দিকে আবাই মারমা আবারো খোরশেদকে ফোন করে জানান, মেয়েটিকে আসলে ভূতে ধরেছিল (দেবতায় পেয়েছিল), একজন বৈদ্য আনা হয়েছিল, ঝাড়ফুঁক করেছে, এখন সুস্থ আছে। এই বিষয়ে সকালে কথা হবে বলে তিনি ফোন কেটে দেন। আবাই মারমা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে আবারো ফোন করে জানান, মেয়েটি অসুস্থ বোধ করছে, তাই তাকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে।

এদিকে রাত ১টা ৪০ মিনিটের দিকে ৫০/৬০ জন উপজাতি নারী-পুরুষ মিলে খোরশেদের বাড়ির সামনে গিয়ে তাকে ডাকাডাকি করেন। খোরশেদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে তাকে তারা জানান, মেয়েটিকে আসলে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ধর্ষণকারী হচ্ছে স্থানীয় বাপ্পী শীলের বড় ছেলে নয়ন শীল। ভিকটিম মেয়েটি তার ছবি শনাক্ত করেছে, তারা সেই ছবি সাথে নিয়ে এসেছেন। তখন খোরশেদ তাদের সাথে নিয়ে বাপ্পী শীলের বাড়িতে যান। গভীর রাত, তাই সবাই ঘুমে ছিল। ডাকাডাকিতে সাড়া না দেয়ায় মারমা ছেলেরা গেইট ভেঙ্গে বাড়িতে ঢুকে। শব্দ পেয়ে বাপ্পী শীল ঘুম থেকে উঠে এলে তার বড় ছেলে নয়ন শীল ওই মারমা কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে বলে ছেলের ছবি দেখিয়ে তাকে বের করে দিতে বলা হয়। বাপ্পী শীল তার বড় ছেলে নয়ন শীলের ছবি দেখে বলেন, আমার ছেলে নয়ন তো বাড়িতে নাই। সে কাপ্তাই পলিটেকনিকে পড়ে। ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে নয়ন সেখানে আছে। তখন বিষয়টি প্রমাণের জন্য নয়ন শীলকে ভিডিও কল করেন তার বাবা। ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে নয়ন শীল কাপ্তাইয়ে তার হোস্টেলের দৃশ্য সবাইকে দেখান। এটা দেখে মারমা নারী-পুরুষরা কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়। একটু পর তারা বলে, তাহলে ছোট ছেলে ধর্ষণ করেছে। বাপ্পী শীলের ছোট ছেলে শয়ন শীলকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। এই পর্যায়ে খোরশেদ তাদের বলেন, এটা কী ধরনের কথা হলো? ভিকটিম মেয়ে বড় ছেলে নয়ন শীলের ছবি দেখে শনাক্ত করেছে। এখন সেই ছেলে এলাকায় নেই বলে তোরা ছোট ছেলেকে অপরাধী বলে তাকে নিয়ে যাবি? এটা তো কোনো যুক্তি হতে পারে না। তবে যদি সন্দেহ থাকে তাহলে তোরা আইনের আশ্রয় নিতে পারোস। আদালতে যদি প্রমাণ হয়, তাহলে অপরাধীর উপযুক্ত সাজা হবে। তাতে কারো কোনো সমস্যা থাকবে না। তখন তারা আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে সকালে এই বিষয়ে কথা হবে বলে সেখান থেকে চলে যায়।

একদিকে আবাই মারমাসহ অন্যরা যখন বাপ্পী শীলের বাড়িতে গিয়ে কথা বলছিল, অন্যদিকে আবাই মারমার শ্যালক ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল (বিএমএসসি), খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উক্যানু মারমা ফেসবুকে পোস্ট করে যে, মারমা মেয়েটিকে তিনজন বাঙালি মিলে ধর্ষণ করেছে। একই সময় মনি মারমা, ইমন চাকমাসহ আরও অনেকে বাপ্পী শীলের বড় ছেলে নয়ন শীলের ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট করে বাঙালিদের দ্বারা মারমা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে বলে প্রচার করতে থাকে। এসব ফেসবুক পোস্ট দ্রুত কপি করে এবং শেয়ার করে আরো অনেকেই ছড়াতে থাকে। রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠনের নেতা উক্যানু মারমা এবং ইউপিডিএফ সমর্থিত সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক কৃপায়ন ত্রিপুরা, বাগিস চাকমাসহ ৮ জন মিলে ভিকটিম কিশোরী ও তার পিতাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করে তখনই মেয়েটির ধর্ষণের পরীক্ষা করতে বলে। দায়িত্বরত চিকিৎসক এটা একটা নিয়মের মধ্যে করতে হয় এবং তার জন্য কিছু সময়ের প্রয়োজনের কথা জানালে তারা মেয়েকে ভর্তি রেখে আসে। হাসপাতালে ভর্তির পূর্বেই উক্যানু মারমা রাত সাড়ে ১২টার দিকে খাগড়াছড়ি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাতেন মৃধাকে ফোন করে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা গ্রহণের জন্য বলেন। রাত দেড়টার দিকে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভিকটিমের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য হাসপাতালে আসেন। হাসপাতাল থেকে থানায় ফিরে গেলে উক্যানু মারমা পুনরায় রাত ২টার দিকে ফোন করে ওসিকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা গ্রহণ করতে বলেন।

এদিকে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সকালে মামলা গ্রহণের কথা বললে উক্যানু মারমা তার লোকজনসহ রাত ৩টায় থানায় হাজির হন এবং মামলা গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এ প্রেক্ষিতে ভোর পৌনে ৫টার দিকে মেয়েটির পিতা অজ্ঞাতনামা ৩ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে খাগড়াছড়ি সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাধারণ ডায়েরিটিকে পরের দিন ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন। ওই দিকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডা. জয়া চাকমার নেতৃত্বে এবং ডা. মো. মীর মোশারফ হোসেন ও সহকারী সার্জন ডা. নাহিদা আক্তারকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় ভিকটিমের মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য নমুনা (স্যাম্পল) সংগ্রহ করা হয়। ওইদিন সকালে উক্যানু মারমা, কৃপায়ন ত্রিপুরা ও বাগিস চাকমার নেতৃত্বে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলা হয় এবং সেই পেজ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সকাল ১০টার দিকে বাপ্পী শীলের ছোট ছেলে শয়ন শীলকে (১৯) সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটক করে পুলিশ।

আসামিকে আদালতে সোপর্দ করলে পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শয়ন শীলের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন সন্দেহভাজন এক আসামিকে আটক করে রিমান্ডে নিচ্ছে এবং অপর আসামিদের ধরার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে, তার মধ্যেই বিচার ও শাস্তির দাবিতে ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা শহরের শাপলা চত্বরে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তাল করা শুরু হয়।

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

যার রেশ চলে টানা পাঁচ দিন ধরে এবং তাতে হতাহতসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় জেলা সদর এবং গুইমারা উপজেলায়। ৩০ সেপ্টেম্বর মারমা কিশোরীর ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফলে যখন ধর্ষণের কোনো আলামত না পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে, তখন আন্দোলনের নামে টানা পাঁচ দিনের তাণ্ডব নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। গণমাধ্যমে ধর্ষিতার পরিবার ধর্ষণের স্থান হিসেবে একটি ধানক্ষেত দেখায়। কিন্তু ওই স্থানে প্রায় হাঁটু পানি। এত পানির মধ্যে কীভাবে ধর্ষণ সম্ভব সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে আটক শয়ন শীলের পিতা বাপ্পী শীল পার্বত্য দর্পণকে বলেন, ‘তারা প্রথমে আমার বড় ছেলে নয়ন শীলের ছবি নিয়ে এসে বলেছে যে, নয়ন শীল তাদের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু ভিডিও কলে যখন আমার ছেলে নয়ন কাপ্তাইতে আছে দেখালাম তখন তারা বলল, তাহলে তোর ছোট ছেলে শয়ন শীল ধর্ষণ করেছে। এটা কি কোনো যুক্তি হতে পারে? তাছাড়া, ঘটনা ঘটেছে রাত ৯টার সময়। আর সেসময় আমার ছোট ছেলে দুর্গাপূজার কেনাকাটা করছিল সদরের বিভিন্ন দোকানে। পুলিশ সেসব দোকানের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। তাহলে, আমার ছেলে কীভাবে তাদের মেয়েকে ওই সময় ধর্ষণ করল? দুর্গাপূজার এই উৎসবের সময় আমার ছেলেটাকে আসলে ফাঁসানো হয়েছে। স্বনির্ভর বাজারে আমার সেলুনের দোকান ছিল, সেটাও ভেঙে দিয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’

২৩ সেপ্টেম্বর মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার পর রাত ১০টা ৪৩ মিনিটে মো. খোরশেদকে ফোন করে যে আবাই মারমা প্রথম বাঙালিদের দ্বারা ধর্ষণ হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তার সাথে কথা বলেছে পার্বত্য দর্পণ। সিঙ্গিনালার মেংমাঅং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সেই আবাই মারমা পার্বত্য দর্পণের সঙ্গে খোরশেদকে একাধিকবার ফোন করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কখন কী বলেছেন, সেটা তার ঠিক মনে নেই বলে জানান। তিনি এটাও বলেন যে, তিনি যা যা বলেছেন সেটা তার নিজের কথা ছিল না। মেয়েটি এবং তার পরিবারের কাছ থেকে যা যা শুনেছেন খোরশেদকে তাই বলেছেন।

আপনার প্রথমে বাপ্পী শীলের বড় ছেলে নয়ন শীলে ছবি নিয়ে রাতে তার বাসায় গেছেন, পরে যখন জানতে পারলেন নয়ন শীল খাগড়াছড়িতে নেই, কাপ্তাই আছে; তখন আবার ছোট ছেলে শয়ন শীলকে দায়ী করলেন, এটা ঠিক হলো কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেয়ে শনাক্ত করেছে, আমরা তো শনাক্ত করি নাই।’

ধর্ষণের অভিােগকারী কিশোরীর বাবা বিবিসি বাংলাকে জানান, ধর্ষণ সংক্রান্ত শারীরিক পরীক্ষার মেডিকেল রিপোর্টের বিষয়ে আদালতে যাবেন না তারা। এর কারণ হিসেবে নিজেদের আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন তিনি। অপরদিকে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি নিজে থেকে মেয়ের বাবাকে বলেছি, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে উন্নত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে যেতে চাইলে সহযোগিতা করব। কিন্তু কেন জানি তারা রাজি হননি।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খাগড়াছড়ি সদর থানার এসআই মো. আলাউদ্দিন পার্বত্য দর্পণকে ২২ অক্টোবর সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে জানান, ‘শয়ন শীল ধর্ষণ করেছে বলে ভিকটিম মেয়েটি শনাক্ত করেছে। তাই তাকে আটক করা হয়েছে। অপর আসামিদের ব্যাপারে কোনো তথ্য-উপাত্ত এখনো পাওয়া যায়নি। তাই আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের ধরতে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’

ঘটনার সময় শয়ন শীল বিভিন্ন দোকানে পূজার কেনাকাটা করেছে, সেসব দোকানের সিসিটিভির ফুটেজেও তার সত্যতা আছে, তাহলে শয়ন শীল একদিকে বাজারে কেনাকাটা, অন্যদিকে সিঙ্গিনালা এলাকায় ওই মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে; এই দুটি ঘটনা কীভাবে একসঙ্গে সত্য হতে পারে? জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাত ৯টায়, অন্যদিকে আটক শয়ন শীল এবং তার বাবা বাপ্পী শীলের কথা মতে, সেসময় বিভিন্ন দোকানে কেনাকাটা করেছে শয়ন শীল। তাদের তথ্য যাচাই করতে কয়েকটি দোকানের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখা গেছে, ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা থেকে পৌনে ১০টা পর্যন্ত ওইসব দোকানে গেছে শয়ন শীল। সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।’

ইউপিডিএফ কানেকশন

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সভাপতিত্বে খাগড়াছড়ি জেলা সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত সমঝোতা বৈঠকে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে যারা যোগ দেন তারা এসেছিলেন মূলত ইউপিডিএফ (মূল) এর খাগড়াছড়ি সদরের সংগঠক ও মুখপাত্র অংগ্য মারমার প্রতিনিধি হিসেবে। কেননা, প্রশাসনের পক্ষ থেকে অংগ্য মারমার সাথেই আলোচনার জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। তখন তিনি নিজে না এসে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাড়ে ১২টায় শুরু হওয়া বৈঠকে জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানার থেকে বাগিস চাকমা, ছদক চাকমা, কৃপায়ন ত্রিপুরা, পিন্টু তালুকদার, তোশিতা চাকমা ও মানিক চাকমা যোগ দিয়েছিলেন। বৈঠক শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা রাঙামাটিতে এক মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, ‘আজকে জুম্ম ছাত্র-জনতার হয়ে যে ৬ জন বৈঠকে এসেছিলেন, তাদেরকে আমি জিজ্ঞেস করেছি, তোমাদের মধ্যে কে কে ইউপিডিএফ? তারা স্বীকার করেছেন, তারা সবাই ইউপিডিএফের।’

খাগড়াছড়িতে কথিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের অন্তরালের ঘটনা, পার্বত্য দর্পণের অনুসন্ধান

অপরদিকে ইউপিডিএফের সংগঠক মাইকেল চাকমা একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে খাগড়াছড়িতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে ‘পাহাড় থেকে সেনা হঠাও’, ‘বাঙালিদের ফিরিয়ে নাও’ এসব স্লোগান দেয়া প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘ধর্ষণ তো একটি উপলক্ষ মাত্র।’

প্রতিবেশী কানেকশন

তবে স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্রগুলো ফোনে আঁড়ি পেতে এই ঘটনার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে স্থানীয় একটি আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনের কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মোবাইল নম্বরে ফোন করে উস্কানিমূলক কার্যক্রম করা, সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করাসহ বিভিন্ন উস্কানিমূলক বার্তা দেয়া হয় বলে জানতে পেরেছেন। এছাড়াও তাদেরকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও মামলা হলে সীমান্তের ওপারে আশ্রয় এবং আহত হলে চিকিৎসা সহায়তা দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। এছাড়াও জুম্ম ছাত্র-জনতার সাথে পলাতক লীগের সম্পৃক্ততার সুস্পষ্ট যোগাযোগের তথ্যও গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা পাহাড়ি নেতাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে আর্থিক ও সকল ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে। কাজেই খাগড়াছড়ির ঘটনা যে কেবল একটি মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ তা নয়, বরং এর সাথে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র জড়িত।

সূত্র: পার্বত্য দর্পণের প্রিন্ট ভার্সন থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *