চীনের হস্তক্ষেপে মিয়ানমারের যুদ্ধের মোড় ঘুরল: মান্দালয় দখলের সুযোগ হারাল পিডিএফ
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের উত্তর শান রাজ্যে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাতে সামরিক জান্তার পক্ষে চীনের সরাসরি ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপ দেশটির প্রতিরোধ আন্দোলনের কৌশলগত অগ্রযাত্রাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে বেসামরিক ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) সশস্ত্র শাখা পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) ও তাদের মিত্রদের মান্দালয় দখলের প্রচেষ্টা কার্যত ভেস্তে গেছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি সামরিক জান্তার পাল্টা অভিযানের মুখে পিডিএফ প্রায় পুরো উত্তর মান্দালয় অঞ্চল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এই অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ভারী গোলাবারুদের ব্যবহার দেখা গেছে, যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই চীনের সরবরাহকৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় উত্তর শান রাজ্যে যুদ্ধবিরতির পর সেখান থেকে সেনা পুনর্বিন্যাস করে মান্দালয়ের দিকে মোতায়েন করে জান্তা বাহিনী।

এর ফলে গণতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মান্দালয় দখলের যে সুযোগ তৈরি করেছিল, তা হাতছাড়া হয়ে যায়। এক পর্যায়ে পিডিএফ বাহিনী মান্দালয়ের কেন্দ্রীয় আঞ্চলিক সামরিক কমান্ড থেকে মাত্র ২২ কিলোমিটার দূরের পাতেইংগি টাউনশিপ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। শহরের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো পিডিএফের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, কৌশলগত দিক থেকে উত্তরের পতন তাদের বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘অপারেশন ১০২৭’-এর আওতায় ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের তিন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন—মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), তাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) ও আরাকান আর্মি (এএ)—পিডিএফ ও অন্যান্য প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে উত্তর শান রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা, এমনকি রাজধানী লাশিওও দখল করেছিল। একই সময়ে টিএনএলএর সহায়তায় মান্দালয় অঞ্চলের থাবেইক্যিন ও সিংগু টাউনশিপ দখলে নেয় পিডিএফ, পরে মাদায়া ও পাতেইংগিতেও অগ্রসর হয়। উত্তর শান ও মান্দালয়ের রুবি হাব হিসেবে পরিচিত মোগোক এবং নিকটবর্তী মংমিতও দখলে আসে এই জোটের হাতে।

তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়, যখন চীন এমএনডিএএ ও টিএনএলএর ওপর চাপ সৃষ্টি করে জান্তার বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য করে। বেইজিং সীমান্ত গেট বন্ধ করে দিয়ে জাতিগত বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহের পথও কার্যত রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
চীনের চাপ শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। শান রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ)-এর বিরুদ্ধেও কড়াকড়ি আরোপ করে বেইজিং। সীমান্ত বন্ধ, ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত ও সম্পদ জব্দের মুখে পড়ে ওয়া নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ওয়া স্টেট পার্টি (ইউডব্লিউএসপি)। শেষ পর্যন্ত তারা এমএনডিএএ, টিএনএলএ ও শান স্টেট প্রগ্রেসিভ পার্টিকে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করতে সম্মত হয়।
২০২৫ সালের আগস্টে ইউডব্লিউএসপির সহ-সভাপতি শাও গুয়োআন প্রকাশ্যে বলেন, চীনের চাপ তাদের ৪০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছে। তিনি সতর্ক করেন, সমর্থন বন্ধ না করলে বেইজিং আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।
২০২৪ সালেই চীন এমএনডিএএর ওপর সরাসরি চাপ বাড়ায়, এমনকি সংগঠনটির নেতা পেং দারেনকে আটকও করা হয়। এরপর এমএনডিএএ ঘোষণা দেয়, তারা মান্দালয় বা দক্ষিণ শান রাজ্যের রাজধানী তাউংজি আক্রমণ করবে না এবং চীনের বিরোধী কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে সহযোগিতায় যাবে না। টিএনএলএও স্বীকার করে যে, জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই বন্ধে তাদের ওপর হুমকি ও চাপ এসেছে।

চীনের মধ্যস্থতায় ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার পর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এমএনডিএএ লাশিও শহরের নিয়ন্ত্রণ জান্তার হাতে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তবে তারা শহরের গ্রামাঞ্চলীয় অংশে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে কার্যত জান্তা বাহিনীকে ঘিরে রাখে। তবুও এই যুদ্ধবিরতির সুযোগে জান্তা টিএনএলএ নিয়ন্ত্রিত নাওংখিও, কিয়াউকমে ও হসিপাও পুনর্দখল করে নেয় এবং মিয়ানমার-চীন বাণিজ্য পথ আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর ফলেই উত্তর মান্দালয়ে পিডিএফের সরবরাহ পথ কেটে যায়। চীনের চাপ ও জান্তার বিমান হামলার মুখে শেষ পর্যন্ত টিএনএলএ ২০২৫ সালের অক্টোবরে মোগোক ও মংমিতও ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিদ্রোহী ক্যাপ্টেন জিন ইয়াও বলেন, এমএনডিএএ ও জান্তার যুদ্ধবিরতি টিএনএলএকে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং তারাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে।

তবে টিএনএলএর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। এমএনডিএএর বিপরীতে গিয়ে তারা মোগোক ও মংমিত হস্তান্তরের আগে পিডিএফসহ মিত্র বাহিনীকে সরে যেতে বাধ্য করে এবং জান্তা কনভয়কে নিরাপত্তা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তারা মংমিতে জান্তা বাহিনীকে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) হামলা থেকে রক্ষা করছে এবং গ্রামাঞ্চলে জান্তার বিস্তারেও সহায়তা করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মোগোক দখলের পর টিএনএলএ প্রশাসনে ব্যর্থ হয় এবং অতিরিক্ত রুবি খননের মাধ্যমে স্থানীয় স্বার্থ উপেক্ষা করে। সম্প্রতি থাবেইক্যিন-মোগোক সড়কও জান্তা বাহিনী পুনর্দখল করেছে।
এক সামরিক বিশ্লেষক বলেন, নাওংখিও ও মোগোক-পিন ও লুইন সড়ক হারানোর মধ্য দিয়ে উত্তর মান্দালয়ে পিডিএফ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি এই ঘটনাকে পিডিএফের জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে ভবিষ্যৎ জোটনীতি পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দেন।

পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) মুখপাত্র দাও নি নি কিয়াও বলেন, মিত্রদের সঙ্গে দৃঢ় ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও পিডিএফের এই ক্ষতির অন্যতম কারণ। মান্দালয় পিডিএফের মুখপাত্র ওসমন্ড এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর মান্দালয়ের প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো এখন আবার গেরিলা যুদ্ধের পর্যায়ে ফিরে গেছে। অঞ্চল পুনর্দখলে সময়, পুনর্গঠন ও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে চীনের চাপ। পিএলএ মুখপাত্রের ভাষায়, “চীনের চাপ কাটিয়ে ওঠা না গেলে জান্তার কাছ থেকে হারানো এলাকা পুনর্দখল করা অত্যন্ত কঠিন হবে।”
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে চীনের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ কেবল সামরিক ভারসাম্যই নয়, প্রতিরোধ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কৌশল ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।