মিত্র ইরানকে ছেড়ে ইসরায়েলের দিকে কেন ঝুঁকছে মোদির ভারত?

মিত্র ইরানকে ছেড়ে ইসরায়েলের দিকে কেন ঝুঁকছে মোদির ভারত?

মিত্র ইরানকে ছেড়ে ইসরায়েলের দিকে কেন ঝুঁকছে মোদির ভারত?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলতার ঠিক দুই দিন আগে কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করলেনগত সাত দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে যখন ইরানে সহস্রাধিক প্রাণহানি ঘটেছে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছেতখন ভারতের এই অবস্থান নিয়ে খোদ দেশটিতেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারত কেবল যে শোক প্রকাশ থেকেই বিরত ছিল তা নয়বরং দেশটির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু তেহরানের প্রতি মোদি সরকার এক ধরনের ‘হিমশীতল’ নীরবতা বজায় রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।

চলমান যুদ্ধের শুরুতে ভারতের আমন্ত্রণে এক নৌমহড়ায় অংশ নিয়ে ফিরতি পথে একটি ইরানি জাহাজ মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে ধ্বংস হয়যাতে বহু ইরানি নাবিক নিহত হন। ভারতের প্রতিবেশী অঞ্চলে এমন ঘটনায় নয়াদিল্লির নীরবতাকে সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা ‘কৌশলগত লজ্জা’ এবং ভারতের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে অভিহিত করেছেন। দশকের পর দশক ইরান ভারতকে অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করলেওবর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেনভারত কি তার ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে?

বিশ্লেষকদের মতেভারতের এই অবস্থান হঠাৎ করে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্ত নয়। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত ধীরে ধীরে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হওয়ার পথে এগিয়েছে। মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেখক সুচিত্রা বিজয়ন বলেনইসলামভীতি এখন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত এখন অসাম্প্রদায়িক নীতির বদলে মুসলমানদের ‘কৌশলগত নির্মূল’ করার নীতিতে বিশ্বাসী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সুরক্ষা বলয়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি:এপি
ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: এপি
ভারতীয় কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যেইসরায়েল কেবল ভারতের অস্ত্র সরবরাহকারী নয়বরং একটি ‘মডেল’। ভারতের পুলিশ ও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ইসরায়েল সফর করেন তাদের শাসন পদ্ধতি ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের কৌশল শিখতে। কাশ্মীরে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া কিংবা কৃষকদের আন্দোলনে যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছেসেগুলোর অনেক কিছুই ইসরায়েলি আদলে গড়া।

গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে ভারতের ভূমিকা এখন ইরানের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে। গত আড়াই বছরে গাজায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি হতাহত হলেও ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করেছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্টভাবে বলেছেনজাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ইসরায়েল সবসময় ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছেতাই ভারতও তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।

ইরান যুদ্ধে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে ভারতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ভারতের হাতে মাত্র এক মাসের জরুরি জ্বালানি মজুত রয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয়র রেমিট্যান্স ও জীবনযাত্রা এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। আকাশপথ বন্ধ থাকায় তাদের সরিয়ে আনাও প্রায় অসম্ভব।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছেতবে নয়াদিল্লি সম্ভবত একটি বড় বাজি ধরেছে। যদি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে এবং নতুন কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনরায় যুক্ত হয়তবে ভারত সেই সুযোগ নিতে চায়। এরই মধ্যে ইরান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ভারত চাবাহার বন্দর প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। আদানিআম্বানি ও টাটার মতো বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও লজিস্টিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তারা যুদ্ধের পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখার অপেক্ষায় রয়েছে।

মোদি ইসরায়েল পৌঁছানোর এক দিন আগে নেতানিয়াহু ছয় দেশের একটি নিরাপত্তা জোটের কথা ঘোষণা করেছেনযার অন্যতম প্রধান সদস্য ভারত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই অক্ষশক্তির প্রধান কাজ হবে ‘উগ্রপন্থি’ শক্তিগুলোকে দমন করা। ভারত এই অক্ষে শ্রম ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতেভারত কেবল যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েল বলয়েই প্রবেশ করেনিবরং এমন এক জোটে শামিল হয়েছে যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যায় বিচলিত নয়। মোদি সরকারের এই হিন্দুত্ববাদী পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে জোরালো কোনও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ না থাকায় নিকট ভবিষ্যতে ভারতের এই অবস্থানে কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।