সার ও জ্বালানির দাম বাড়ায় মিয়ানমারে খাদ্য সংকট ভয়াবহ, চালের মূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা

সার ও জ্বালানির দাম বাড়ায় মিয়ানমারে খাদ্য সংকট ভয়াবহ, চালের মূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা

সার ও জ্বালানির দাম বাড়ায় মিয়ানমারে খাদ্য সংকট ভয়াবহ, চালের মূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারে চলমান সরবরাহ সংকটের কারণে সার ও জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় চালের দাম আরও বাড়বে এবং ইতোমধ্যে “বিপর্যয়কর” পর্যায়ে পৌঁছানো খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে সতর্ক করেছে World Food Programme (ডব্লিউএফপি)।

জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানিয়েছে, সার সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা সার ব্যবহারে কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ডব্লিউএফপি বলেছে, সার ব্যবহারে ৫০ শতাংশ কমানো হলে ধানের ফলন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা আগে থেকেই নাজুক চালের বাজার ও খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে দেবে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব দেশজুড়ে পড়বে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক এবং গ্রামীণ ও সংঘাতপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

মিয়ানমারের কৃষি খাত এখনো আমদানিনির্ভর। দেশটির সার, বীজ ও কীটনাশক সমিতির তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ লাখ টনের বেশি সার আমদানি করা হয়েছে। World Bank-এর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের মোট সার আমদানির প্রায় অর্ধেকই আসে চীন থেকে। তবে মার্চের শেষ দিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষায় চীন সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করায় মিয়ানমারের কৃষি খাতে চাপ আরও বেড়েছে।

রবিবার জান্তা-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে জানানো হয়, নেপিদোর লেউয়ে টাউনশিপে নিয়ন্ত্রিত মূল্যে (প্রতি ৫০ কেজি বস্তা ১ লাখ ৫ হাজার কিয়াত বা প্রায় ৫০ মার্কিন ডলার) ইউরিয়া সার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ কৃষকের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরিয়া সারের দাম ৯০ হাজার কিয়াত থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার কিয়াতে পৌঁছেছে, যা বোরো মৌসুমের আগে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

সাধারণত কৃষকরা প্রতি একরে এক থেকে দুই বস্তা সার ব্যবহার করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ডেল্টা অঞ্চলের এক কৃষক বলেন, “ভাবুন, ১০ বস্তা ধান বিক্রি করেও এক বস্তা সারের দাম ওঠে না। তাহলে কৃষক কেন সার কিনবে, যখন নিশ্চিত লোকসান হবে?”

তিনি আরও জানান, তিন একর জমি থেকে আগে যেখানে প্রায় ৩০০ বস্তা (৭ টন) ধান উৎপাদন হতো, সেখানে এবার তা কমে ১৩০ বস্তা (৩ টন)-এ নেমে এসেছে। এর পেছনে সারের দাম, পানির খরচ বৃদ্ধি এবং ইঁদুরের আক্রমণকে দায়ী করেন তিনি।

এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ প্রতি একরে ১০ লাখ কিয়াত ছাড়িয়ে গেছে, অথচ বাজারে ১০০ বস্তা ধানের দাম ১৫ লাখ কিয়াতের নিচেই রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট তৈরি হলে মার্চের শুরু থেকে জান্তার ব্যর্থ জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, ফলে জ্বালানির ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ে।

কৃষি খাত এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষকই এখন আসন্ন মৌসুমে চাষাবাদে লাভবান হওয়া নিয়ে সন্দিহান।

কৃষি সেবা প্রদানকারীরা জানিয়েছেন, কৃষকরা এখন জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর ভাড়া নিতে অনাগ্রহী। আয়েয়ারওয়াডি ডেল্টার পান্তানাও টাউনশিপের এক ট্রাক্টর মালিক বলেন, “এই সময় সাধারণত আমাদের প্রচুর কাজ থাকে। কিন্তু এবার এখনো কেউ যোগাযোগ করেনি।”

উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় কৃষকরা বাণিজ্যিক উৎপাদন ছেড়ে কেবল নিজের চাহিদা পূরণের জন্য চাষে ঝুঁকতে পারেন, যা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরেক কৃষক জানান, বহুল ব্যবহৃত মানাও থুকা চালের দাম ৫০ হাজার কিয়াত থেকে বেড়ে ৮০ হাজার কিয়াতে পৌঁছেছে, যা দিনমজুরদের জন্য বাড়তি কষ্ট ডেকে আনছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সংঘাত ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পরিত্যক্ত হয়ে আছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, দেশটি এখন “ভয়াবহ ক্ষুধা পরিস্থিতি”-তে পৌঁছেছে। ২০২১ সালের পর থেকে কৃষি উৎপাদনশীলতা ১৬ শতাংশ কমে গেছে এবং বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে।

প্রসঙ্গত, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ সংকটের কারণে মিয়ানমারের খাদ্য পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *