খাগড়াছড়িতে নদী-খাল দখলের মহোৎসব, বর্ষায় জলাবদ্ধতার শঙ্কা
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে নদী, খাল ও ছড়া দখলের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে শহরের ছোট-বড় প্রাকৃতিক নালাগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত খাগড়াছড়ি খাল, রাঙ্গাপানি ছড়া এবং চেঙ্গী নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে বসতবাড়ি, মার্কেট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। একসময় এসব জলধারা প্রশস্ত ও প্রাণবন্ত থাকলেও বর্তমানে দখল ও ভরাটের কারণে অনেক স্থানে তা প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক দশকেরও বেশি সময় আগে এসব খালে গোসল, মাছ ধরা এমনকি ছোট নৌযান চলাচল করত। কিন্তু বর্তমানে শহরের মিলনপুর, বাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, হোটেল জিরান এলাকা, খাগড়াপুর, মাস্টারপাড়া, ইসলামপুর এবং কলাবাগান এলাকায় প্রভাবশালীদের দখলে প্রাকৃতিক জলধারাগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, খাগড়াছড়ি শহরে অন্তত ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী, খাল ও ছড়া দখলের অভিযোগ এনেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রকল্পও।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, অবৈধ স্থাপনা অপসারণে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হলেও পরবর্তীতে কিছু দখলদার নিজেদের অবস্থান বৈধ দাবি করে পাল্টা চিঠি দেয়। ফলে বিষয়টি কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

পাউবোর তালিকা অনুযায়ী অবৈধ দখলদাররা হলেন: চৌধুরী বোর্ডিংয়ের মালিক প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী, নুরুল আলম, হোটেল নুরের ছালেহ আহম্মদ, ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আবুল হাসেম, গ্রামীণফোন সেন্টারের মধুসূদন দে, সেলিম ট্রেড সেন্টারের মোহাম্মদ সেলিম, ওয়ালটন শোরুমের হারুন রশিদ, গাজী হোটেলের গাজী শহীদ, রাজমিস্ত্রি সমবায় সমিতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বাবুল নাগ ও মো. নেছার উদ্দিন।
এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সভাপতি নির্মল কান্তি দাশ বলেন, “খাল-ছড়া দখল প্রতিরোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে সরেজমিন তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনের দুর্বল অবস্থানের কারণে দখলদাররা আরও সাহসী হয়ে উঠছে।”
অন্যদিকে খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, “একসময় শহরের চারপাশে বহু খাল-ছড়া ছিল, এখন তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রভাবশালীরা নদীর পাড়ে গাইড ওয়াল ও স্থাপনা নির্মাণ করে প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক প্রতিনিধিরা দ্রুত প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা করে নদী ও খাল-ছড়া দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে খাগড়াছড়ি শহর বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জানান, শহরের জলাধারগুলো রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক জলধারা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।