জ্বালানি সংকটে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মিয়ানমার, মস্কোয় নতুন জ্বালানি চুক্তি

জ্বালানি সংকটে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মিয়ানমার, মস্কোয় নতুন জ্বালানি চুক্তি

জ্বালানি সংকটে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে মিয়ানমার, মস্কোয় নতুন জ্বালানি চুক্তি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

তীব্র জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের ছদ্ম-বেসামরিক সরকার দেশ পরিচালনা সচল রাখতে ক্রমেই মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় রাশিয়ার কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে তেল ও গ্যাস সংগ্রহের লক্ষ্যে মস্কোয় নতুন জ্বালানি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দেশটির সরকার।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী কো কো লুইন গত সপ্তাহে চীন ও রাশিয়া সফর করেন, যেখানে তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চালান।

মস্কোতে তিনি রুশ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় স্বল্পমূল্যে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য, এলএনজি, এলপিজি ও সার সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা করেন।

এছাড়া তিনি ইন্টার আরএও (Inter RAO)-এর সঙ্গে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং এলএনজি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরে একই দিনে তিনি রাশিয়ার বিনিয়োগ উন্নয়ন তহবিল আরসি ইনভেস্টমেন্টস (RC Investments)-এর সঙ্গে জ্বালানি প্রকল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অপরিশোধিত তেল সরবরাহ সংক্রান্ত একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

আরসি ইনভেস্টমেন্টস-এর পরিচালক আলেক্সান্ডার শাতিরভ বলেন, এই সমঝোতা স্মারক দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের প্রতিফলন এবং এর মাধ্যমে মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রুশ পেট্রোলিয়াম রপ্তানির একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে। তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে এই অংশীদারিত্বের “বড় সম্ভাবনা” রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করবে, যারা প্রকল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বিষয়ে তথ্য বিনিময় করবে।

সফরকালে কো কো লুইন তার রুশ সমকক্ষ সের্গেই সিভিলেভ এবং প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টা আন্তন কোবিয়াকভের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত করতে মস্কোর কাছ থেকে স্বল্পসুদে ঋণ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করেন। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান জ্বালানি সংকটে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ায় এটি রাশিয়ার ওপর জান্তার ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।

তবে মস্কো ও নাইপিডোর মধ্যে শোধনাগার ও জ্বালানি আমদানি নিয়ে আলোচনা কয়েক বছর ধরেই চললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। ২০২২ সালে রুশ জ্বালানি আমদানির জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ চুক্তিগুলো বাস্তব ফল দেবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত।

গত বছরের জুনে রাশিয়া সফরে তৎকালীন পরিবহনমন্ত্রী মিয়া তুন উ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাশিয়ার বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য মিয়ানমারকে প্রবেশদ্বার হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে পণ্য ইয়াঙ্গুন বন্দর হয়ে সড়ক ও রেলপথে অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশে সরবরাহ করা যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি রুশ বিনিয়োগকারীদের বন্দর, রেলওয়ে ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

মিয়ানমার তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বছরে ৫০ লাখ টন জ্বালানি আমদানিতে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয় হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটজনিত সরবরাহ ব্যাঘাতের কারণে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সরকার কঠোর রেশনিং চালু করে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করছে। এতে ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় ও নাইপিডোর মতো বড় শহরগুলোতে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি তীব্র হয়ে পরিবহন, খাদ্য ও কৃষি খাতে ব্যয় বেড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে দেশজুড়ে চাল, পাম তেল ও লবণের মতো নিত্যপণ্যের দাম গড়ে ১৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে সার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকরা সার ব্যবহার কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ধানের উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগেই মিয়ানমার জ্বালানি সংকটে পড়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য সরকার জ্বালানি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তেল-গ্যাস খাতে বিনিয়োগে আহ্বান জানায়।

রাশিয়া সফরের আগে কো কো লুইন চীন সফরেও স্বল্পমূল্যে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি সহযোগিতা জোরদারে একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দেন।

তবে মস্কো ও বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন থাকলেও, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও চলমান গৃহযুদ্ধ বড় ধরনের বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার এখনো ভবিষ্যৎ প্রকল্পের আশার ওপর নির্ভর করছে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট মিয়ানমারের অর্থনীতি, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *