বান্দরবানে হচ্ছে আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব, মিলবে মানসম্পন্ন চারা
![]()
নিউজ ডেস্ক
- বান্দরবানের বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে হচ্ছে ল্যাবটি
- রোগমুক্ত ও জিনগতভাবে অভিন্ন চারা উৎপাদন হবে
- চলবে পাহাড়ে চাষের উপযোগী ফসল নিয়ে গবেষণা
- ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ
পাহাড়ি এলাকা বান্দরবানে চালু হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম আধুনিক প্ল্যান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বিপুল পরিমাণে রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন এবং পাহাড়ের ফসল নিয়ে গবেষণার জন্য এই ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে।
বান্দরবান সদর উপজেলার বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মাণাধীন পরীক্ষাগারটির কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এটি নির্মিত হচ্ছে।
আমরা আসলে ভবিষ্যতের কৃষির জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং গবেষণাকে মাঠমুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।- প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ল্যাব ভবনের ভেতরে থাকছে আধুনিক মিডিয়া প্রস্তুতি রুম। যেখানে উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও হরমোন মিশ্রিত পুষ্টি মাধ্যম (মিডিয়া) তৈরি করা হবে। সেই সঙ্গে থাকবে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে উদ্ভিদের টিস্যু বা অংশ মিডিয়াতে স্থাপন করার ইনোকুলেশন বা ট্রান্সফার রুম, কালচার বা গ্রোথ রুম, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ও হার্ডেনিং জোন, গ্লাস হাউজ এলাকা এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণের বিশেষায়িত সুবিধা। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামোই এখানে রাখা হচ্ছে।
ভবনের ওপরের অংশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে/ছবি: সংগৃহীত
চারা উৎপাদন ও গবেষণা
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, টিস্যু কালচার ল্যাবে খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ রোগমুক্ত ও জিনগতভাবে অভিন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব। এতে উৎপাদন বাড়বে, রোগের ঝুঁকি কমবে এবং কৃষকের ব্যয়ও কমে আসবে।
তবে এই কেন্দ্র কেবল টিস্যু কালচার চারা উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এখানে পাহাড়ে চাষের উপযোগী ফসল নিয়ে গবেষণা, নতুন জাত সংরক্ষণ, মাতৃগাছ উন্নয়ন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও করা হবে। বিশেষ করে অর্কিড, বিদেশি ফুল, উচ্চমূল্যের ফল, পাহাড়ি মসলা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষির জন্য জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, ‘এটাকে সাধারণ একটা ভবন হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। আমরা আসলে ভবিষ্যতের কৃষির জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং গবেষণাকে মাঠমুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী ড. এম এ রহিম বলেন, টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য, রোগমুক্ত ও মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন করা যায়। বান্দরবানের এই ল্যাব ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন চারা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সিরামিকের ইট ও আয়রন চিপস দিয়ে নির্মিত ভবনে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে/ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাংলাদেশের কৃষি এখন নতুন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করছে। পাহাড়ি অঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল, মসলা ও রপ্তানিযোগ্য ফসলের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত চারা ও প্রযুক্তি সহায়তা পেলে এখানকার কৃষকরা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।
ভবনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অত্যন্ত আধুনিক এই ভবনের কাজ হচ্ছে খুব মানসম্মতভাবে। যেহেতু এটি ল্যাবের ভবন, তাই প্রতিটি উপকরণ ব্যবহারের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।- বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক লিটন দেবনাথ
অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ভবন নির্মাণ
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি ভবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক এর নির্মাণশৈলী। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘নিউক্লিয়াস’ বা কোষকেন্দ্রের আদলে পুরো ভবনটির নকশা করা হয়েছে। নকশায় আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধব ভাবনার সমন্বয় রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিরামিকের ইট ও আয়রন চিপস দিয়ে নির্মিত ভবনের চারপাশ ও ওপরের অংশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে। ফলে ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে। গবেষণাসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এটি একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক লিটন দেবনাথ বলেন, ভবনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অত্যন্ত আধুনিক এই ভবনের কাজ হচ্ছে খুব মানসম্মতভাবে। যেহেতু এটি ল্যাবের ভবন, তাই প্রতিটি উপকরণ ব্যবহারের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নিয়মিত কাজ পরিদর্শন করছেন।
ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে/ছবি: সংগৃহীত
তিনি জানান, গবেষণাগারের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিষয়গুলো মাথায় রেখে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে ভবনের নির্মাণকাজ করা হচ্ছে।
-জাগো নিউজ।