‘বাংলাদেশী-রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে মুম্বাইয়ে উচ্ছেদ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো শতাধিক ঘর ও দুই মসজিদ
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতের মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশন সংলগ্ন গরিব নগর ও পাম্পাপুরা বস্তি এলাকায় রেলওয়ের পরিচালিত এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা, মানবিক সংকট এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৯ মে থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে বুলডোজার দিয়ে শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং দুটি পুরনো মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্ছেদের সময় তাদের “বাংলাদেশী” ও “রোহিঙ্গা” বলে কটূক্তি করা হয়েছে, যদিও তাদের কাছে বহু বছরের পুরনো ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ নথিপত্র রয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, বান্দ্রা টার্মিনাসের সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অনুপ্রবেশ রোধে “অবৈধ দখলদারি বিরোধী” এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে কোনো ধরনের আগাম পুনর্বাসন বা বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করায় তীব্র দাবদাহের মধ্যে শত শত মুসলিম ও দলিত পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সামনে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় এসব পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম রেলওয়ের রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য বুলডোজার নিয়ে গরিব নগর এলাকায় আকস্মিক অভিযান শুরু করে। বাসিন্দাদের দাবি, অভিযানের সময় তাদের ঘর থেকে মালপত্র সরিয়ে নেওয়ারও পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আসিফ বলেন, “এখানে প্রায় ৫০০-র বেশি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৪০টি বাড়িকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ এত জোর খাটিয়েছে যে আমাদের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করারও সময় দেয়নি।”
পশ্চিম রেলওয়ের মুখ্য জনসংযোগ কর্মকর্তা বিনীত অভিষেক এই অভিযানকে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সরকারের “দ্রুততম পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ২৩ মে পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযান চলবে।
উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের ভোটার আইডি, রেশন কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্র দেখান। ৫১ বছর বয়সী মুনাওয়ার শেখ বলেন, “আমার দাদা এই মহল্লাতেই মারা গেছেন। এখানকার অধিকাংশ বাড়ি ৫০ থেকে ৭৫ বছরের পুরনো। নির্বাচনের সময় আমরা বৈধ ভোটার থাকি, রাজনৈতিক দলগুলো ভোট চাইতে আসে। আর ভোট দেওয়া শেষ হতেই আমরা হঠাৎ রোহিঙ্গা হয়ে গেলাম?”
৮৫ বছর বয়সী রুকসানা নামের এক বৃদ্ধা বলেন, “আমরা ৪০ বছর ধরে এখানে আছি। সরকার দারিদ্র্য দূর করছে না, গরিবদের দূর করছে।”
উচ্ছেদ অভিযানে ‘মসজিদ-ই-ইনআম’ এবং ‘ফয়জানে মুস্তফা গরিব নগর মসজিদ’ নামে দুটি পুরনো মসজিদও সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন প্রথমে আশ্বস্ত করেছিল যে উপাসনালয়গুলোতে হাত দেওয়া হবে না। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মসজিদ ভাঙা হয়।
২০ বছর বয়সী তবাসুম বলেন, “মসজিদ ভাঙার আগে কোরআন ও অন্যান্য পবিত্র জিনিস বের করার জন্য আমাদের মাত্র ১০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল।”
মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা পাথর নিক্ষেপ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে নারী ও শিশুসহ বহু মানুষকে মারধর ও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় পুলিশ ৫০ থেকে ৬০ জন বাসিন্দাকে আটক করেছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানের চতুর্থ দিনে গরিব নগরের পাশের দলিত ও মুসলিম অধ্যুষিত পাম্পাপুরা এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়। সেখানেও প্রতিরোধের মুখে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং কয়েকজন দলিত বাসিন্দাকে আটক করে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, অভিযানে একটি আম্বেদকারবাদী সংগঠনের কার্যালয়ও ভেঙে ফেলা হয়েছে। একইসঙ্গে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ছবি ও মূর্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এতে দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তরা ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকাতেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক ৬০ বছর বয়সী নারী অভিযোগ করে বলেন, “গণমাধ্যম আমাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরার বদলে আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে উপহাস করছে এবং ঢালাওভাবে বাংলাদেশী বলে প্রচার করছে।”
বর্তমানে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বান্দ্রা স্টেশনের আশপাশ, ফুটপাত ও ব্রিজের নিচে অবস্থান করছেন উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো। স্থানীয় এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কিছু খাবার ও পানি বিতরণ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পুনর্বাসন বা ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা আসেনি।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বুলডোজার অভিযান, মুসলিম অধ্যুষিত বস্তি উচ্ছেদ এবং “বাংলাদেশী” বা “রোহিঙ্গা” আখ্যা দিয়ে বসতবাড়ি ভাঙার ঘটনা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া এ ধরনের উচ্ছেদ অভিযান নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।