পার্বত্য চুক্তির 'উপজাতি' পরিচয়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী দাবি: তিন জেলা থেকে স্মারকলিপি

পার্বত্য চুক্তির ‘উপজাতি’ পরিচয়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী দাবি: তিন জেলা থেকে স্মারকলিপি

পার্বত্য চুক্তির 'উপজাতি' পরিচয়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী দাবি: তিন জেলা থেকে স্মারকলিপি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন এমপিকে অন্যত্র পদায়ন এবং ২৯৯ নং রাঙ্গামাটি আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রত্যাহারপূর্বক তাকে এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে পুনর্বহালের দাবিতে তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

আজ রবিবার (২১ জুন) সকাল ১০ ঘটিকায় রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা সদরে একযোগে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বর, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাব এবং বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে কয়েক শতাধিক পাহাড়ি/ উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জাতিসত্তার নারী-পুরুষ অংশ নেন।

পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে অন্যত্র পদায়নের দাবিতে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি

রাঙামাটিতে ‘সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক’ ও ‘মহিলা হেডম্যান নেটওয়ার্ক’; খাগড়াছড়িতে ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’ এবং বান্দরবানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির শর্ত মোতাবেক পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্বে একজন উপজাতি নেতার থাকার কথা। মীর হেলাল উদ্দিন চট্টগ্রাম হাটহাজারী আসনের এমপি এবং তাকে পার্বত্যবাসী ভোট দেয়নি। চুক্তির কোথাও বাঙালি নিয়োগের বিধান নেই দাবি করে তারা একে চুক্তি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। কর্মসূচিতে বিএনপি নেতা দীপেন দেওয়ানের উপজাতি ও বাঙালি কিছু অনুসারীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই কর্মসূচির পেছনে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস গ্রুপের মদদ রয়েছে বলে ধারণা করছেন চুক্তি-বিরোধী ইউপিডিএফ গ্রুপের সমর্থকরা। ইউপিডিএফ প্রসীতরা জেএসএস এর বিরোধিতা করতে গিয়ে আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না কিন্তু এটা মুখে বললেও তারা আদিবাসী শব্দের পক্ষে দেখা যায়। শুধু জেএসএসকে উপহাস করতে আদিবাসী শব্দের বিরোধিতা করে। পক্ষান্তরে বাঙালিরা উপজাতি বললেই ক্ষিপ্ত হয় এবং উগ্র আচরণ করে।

এই আন্দোলনের সূত্র ধরে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি ও জাতিগত পরিচয়ের দ্বিমুখী নীতি বা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

আজ মানববন্ধনে মারমা ও চাকমা নারীদের হাতের ব্যানারে স্পষ্ট লেখা ছিল “পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী একজন উপজাতি মন্ত্রী চাই” এবং “পার্বত্য চুক্তি বিরোধী প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ মানি না; মানবো না”।

পার্বত্য চুক্তির 'উপজাতি' পরিচয়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী দাবি: তিন জেলা থেকে স্মারকলিপি

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ‘উপজাতি’ শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্ববিরোধী। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতে এই অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি দাবি করে জেএসএস সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা প্রকাশ সন্তু লারমা ‘উপজাতি’ হিসেবেই মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করেছিল। সরকারি চাকুরি, শিক্ষা ও কোটাসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার সময় তারা এখনও ‘উপজাতি’ পরিচয় ব্যবহার করছে। কিন্তু ২০০৭ সালের জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রের পর থেকে জেএসএস ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো এবং উপজাতিদের বড় একটি অংশ নিজেদের পূর্ব অবস্থান পরিবর্তন করে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে অনড় থাকে। এমনকি বাঙালিরা তাদের ‘উপজাতি’ বললে তারা প্রায়শই ক্ষুব্ধ ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়।

দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজও তখন সুর মিলিয়ে দাবি করে, উপজাতি শব্দ দিয়ে নাকি পাহাড়িদের খাটো করা হয়। অথচ আজ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ও মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে তারা পুনরায় ‘উপজাতি’ পরিচয়কেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রশ্ন উঠেছে, জেএসএস যদি চুক্তির শর্ত মেনে উপজাতি শব্দ ধারণ করে আদিবাসী দাবি থেকে সরে আসে, তবেই তাদের এই দাবি ন্যায্য। কিন্তু স্বার্থের জন্য যখন-তখন পরিচয় বদলানো কি স্রেফ ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নয়? স্বার্থের প্রয়োজনে ‘উপজাতি’ সাজলে এখন আর মানহানি হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্ন খোদ সাধারণ পাহাড়িদেরই আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে করা উচিত।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই নামকরণের লড়াইয়ের পেছনে কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, বরং লুকিয়ে আছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। জাতিসংঘের আদিবাসী সনদের ৩ ও ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পেলে স্বশাসন, এমনকি গণভোটের মাধ্যমে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আইনি পথ তৈরি হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের সময় ‘উপজাতি’ সাজা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের সময় ‘আদিবাসী’ দাবি করা বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের প্রয়োজনে নিরীহ পাহাড়ি নারীদের কখনো ‘আদিবাসী’ আবার কখনো ‘উপজাতি’ হিসেবে রাজপথে নামাচ্ছে, যা মূলত তাদের চরম সুবিধাবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *