রাশিয়া-সমর্থিত দাওয়ে মেগা প্রকল্প ঘিরে প্রতিরোধ বাহিনী দমনের ঘোষণা মিয়ানমার জান্তার
![]()
দক্ষিণাঞ্চলে বড় সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত, দাওয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর ও মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে ‘সন্ত্রাসী’ নির্মূলের হুঁশিয়ারি
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের সামরিক সরকার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়া-সমর্থিত মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধান সড়কগুলোতে সক্রিয় প্রতিরোধ বাহিনীকে ‘চূড়ান্তভাবে দমন’ করার ঘোষণা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার সামরিক বাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল কিয়াও সোয়ার লিন এ ঘোষণা দেন।
মিয়েইক জেলার কিউনসু টাউনশিপে একটি সামরিক গ্যারিসনে কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি বলেন, দাওয়ে গভীর সমুদ্রবন্দরসহ কৌশলগত প্রকল্প এবং ইয়ে-দাওয়ে-মিয়েইক-বোকেপিন-কাওথাউং ইউনিয়ন মহাসড়কে যাত্রীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী প্রতিটি ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে’ অবশ্যই কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
সামরিক বাহিনীর এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সদ্য নিয়োগ পাওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ো সো রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ সফর করেন। সফরকালে মিয়ানমারের লাউংলন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি এবং রাশিয়ার ইন্টার আরএও (Inter RAO)-এর মধ্যে দাওয়ে এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী ম্যাকসিম রেশেতনিকভ এবং মিয়ানমারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অং অং জাও। অং অং জাওকে সামরিক সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তিনি সম্প্রতি মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত ও চীন সফরেও সফরসঙ্গী ছিলেন।
দাওয়ে প্রকল্পকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প এলাকা এবং জ্বালানি অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পটি প্রথমে থাইল্যান্ড ও জাপানের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হলেও অর্থায়ন সংকটে তা স্থবির হয়ে পড়ে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিন অং হ্লাইং প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে রাশিয়ার সহযোগিতা চান। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে ২ লাখ টনের বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হবে।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের বিদ্যুৎমন্ত্রী কো কো লুইন রাশিয়া সফর করে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তার এই বক্তব্য দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক অভিযানের নতুন কৌশলগত গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
থানিনথারি অঞ্চল সফরের সময় কিয়াও সোয়ার লিন মিয়েইক ও বোকেপিন এলাকাও পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছে।
তবে বাস্তবে প্রকল্প করিডোরজুড়ে সরকারি বাহিনী ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং বেসামরিক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এর কয়েকদিন আগেই থানিনথারি আঞ্চলিক প্রশাসনের নিরাপত্তা ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন কর্মকর্তা জিন ইয়াও বলেন, উপ-সেনাপ্রধানের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেনাদের মনোবল বৃদ্ধি করা এবং সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া। তার ধারণা, সফরের পর উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিরোধ ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক অভিযান শুরু হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, রাশিয়ার প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, প্রকল্প এলাকা এখনও সশস্ত্র সংঘাতে অস্থির। গভীর সমুদ্রবন্দর ও তেল শোধনাগার নির্মাণে কয়েকশ কোটি ডলার ব্যয় হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের বর্তমান বাজারে লাভজনক বিনিয়োগের নিশ্চয়তা না থাকায় রাশিয়া শেষ পর্যন্ত বড় পরিসরে বিনিয়োগে অনাগ্রহী হতে পারে।
তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার ও রাশিয়ার সম্পর্ক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। অস্ত্র বিক্রির পাশাপাশি কূটনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এমনকি পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বেড়েছে। বর্তমানে রাশিয়া বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের অন্যতম, যারা মিন অং হ্লাইংয়ের পুনর্গঠিত সামরিক-সমর্থিত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।