পাহাড় কি তবে যুদ্ধক্ষেত্র? অস্ত্রধারী এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কারা?

পাহাড় কি তবে যুদ্ধক্ষেত্র? অস্ত্রধারী এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কারা?

পাহাড় কি তবে যুদ্ধক্ষেত্র? অস্ত্রধারী এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা কারা?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি একটি প্রান্তিক দুর্গম উপজেলা। ৩৩৪.১১ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান পাহাড়, উপত্যকা ও ভারত সীমান্ত ঘেঁষে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মেরুকরণ মূলত এই পানছড়ি থেকেই নির্ধারিত হয়। এই উপজেলায় উপজাতীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর প্রথম অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দেয় ১৯৮৩ সালে। সে সময় নিজ দলীয় লোকজনের হাতে নিহত হন পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদের প্রথম প্রবক্তা ও জন সংহতি সমিতি (জেএসএস) প্রতিষ্ঠাতা এমএন লারমা। তার এই হত্যার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে সন্ত্রাসবাদের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। লারমার মৃত্যুর পর দল দুটি ভাগে বিভক্ত হয় প্রীতি গ্রুপ এবং বাদী গ্রুপ। পরবর্তীতে বাদী গ্রুপ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে এমএন লারমার ছোট ভাই সন্তু লারমা জেএসএস-এর সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সন্তু লারমার জেএসএস-এর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। তৎকালীন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা এই চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং স্বায়ত্তশাসন দাবিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে সন্তু লারমার জেএসএস এবং প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ-এর মধ্যে চুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান তৈরি হয়। দুই পক্ষই পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা এবং প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, এই পানছড়ি থেকেই পার্বত্য চুক্তির সূচনা হয়েছিল।

অর্থাৎ পাহাড়ের সংঘাত, শান্তি কিংবা অশান্তি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই উপজেলা।

সূত্র বলছে, দু’টি গোষ্ঠীর এই সংঘাত শুধু অধিকার আদায়ের লড়াই নয়। এটি সম্পূর্ণ চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত বিভিন্ন সময় সমোঝোতার মাধ্যমে সাময়িক বন্ধ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বর্তমানে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, কাউখালী এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও পানছড়ি সংঘাতের প্রধান ময়দানে পরিণত হয়েছে।

ভারত সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় চুক্তির পূর্ব থেকেই জেএসএস পানছড়ি রুট ব্যবহার করে ভারত থেকে অস্ত্র আনত এবং যাতায়াত করত। চুক্তির পর জেএসএস পার্বত্য অঞ্চলের অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারায়। অন্যদিকে পানছড়ি হয়ে ওঠে ইউপিডিএফ-এর দুর্গ। তবে সীমান্ত সংলগ্ন ‘দুদুকছড়া’ এলাকাটি অস্ত্র আনা-নেওয়ার রুট হিসেবে জেএসএস নিজেদের দখলেই রাখে। পরবর্তীতে জেএসএস এই এলাকা সংলগ্ন ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি এলাকা দখলে অভিযান শুরু করে। স্থানীয় উপজাতিরা এই সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদকে “ধর্ম যুদ্ধ” হিসেবে অভিহিত করে থাকে। জেএসএস-এর সশস্ত্র গ্রুপের নাম ‘জুম্ম লিবারেশন আর্মি’ (জেএলএ) এবং ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র গ্রুপের নাম ‘জুম্ম গণপ্রতিরোধ ফোর্স’।

পানছড়ি উপজেলার উত্তর অঞ্চলের ২ নং চেঙ্গী ইউনিয়নের তারাবন, জগপাড়া ও তারাবনিয়া এলাকায় গত ০৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে সশস্ত্র গোলাগুলি শুরু হয়। এই থেমে থেমে চলা গোলাগুলি ০৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। প্রচণ্ড গোলাগুলির কারণে আশেপাশের ৪-৫টি পাড়ার বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারা গবাদিপশু রেখে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং সেগুলোও গুলির লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। গুলির তীব্রতায় স্থানীয় বনাঞ্চল ও ঘরবাড়িতে চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কেবল জঙ্গলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারা লোকালয়ে এসে পাকা ও মাটির ঘর কিংবা খোলা জায়গায় বাঙ্কার নির্মাণ করে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। এই গোলাগুলির প্রভাব পড়ছে বৌদ্ধ উপাসনালয় ‘তারবন ভাবনা কেন্দ্রে’। ফলে সেখানে অবস্থানরত ধর্মগুরুদের খাদ্য সংস্থান, ধর্মীয় আচার পালন ও স্বাভাবিক চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পার্বত্য চুক্তির পর এমন ভয়াবহ সংঘর্ষ তারা পাহাড়ে আর দেখেননি। দু’টি পক্ষই সাধারণ মানুষকে প্রতিপক্ষ মনে করে গুলি ছুড়ছে। এই যুদ্ধের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, আনুমানিক ৭-৮ কোটি টাকার গোলাবারুদ খরচ হয়েছে সূত্রের ধারণা।

প্রতিপক্ষ দমনের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ মুখোমুখি যুদ্ধে জড়িয়েছে। তবে এটি সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে বেশি রূপ নিয়েছে। পার্বত্য এলাকার সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নানা তথ্য ছড়াচ্ছে। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। উভয় পক্ষ হতাহতের দাবি করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেনি। সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে সশস্ত্র জনবল বৃদ্ধি করছে উভয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

এই সংঘর্ষ কতদিন চলবে তা কারও জানা নেই। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। যারা রয়ে গেছে, তারা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। জেএসএস চাইছে এলাকাগুলো দ্রুত ইউপিডিএফ-এর থেকে নিয়ন্ত্রণে নিতে, আর ইউপিডিএফ চাইছে নিজেদের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের আধিপত্য থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে আলাদা শাসন ও আলাদা সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ে এই সন্ত্রাসবাদ কীভাবে নির্মূল হবে, তা আজ পাহাড়ি জনগণের বড় প্রশ্ন। সাধারণ জনগণ স্বজাতি অধিকারের নামে পরিচালিত এসব সন্ত্রাসী সংগঠন থেকে মুক্তি চায়। যেসব সংগঠন বসতঘর দখল, লুটপাট, চাঁদা দাবি এবং অবাধ্য হলে হত্যা করে, তাদের পাহাড়ি জনগণ আর চায় না।

আজ পাহাড়ে সাধারণ মানুষ সরব হচ্ছে। আঞ্চলিক দলগুলো অধিকারের দোহাই দিয়ে অস্ত্রের জোরে নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে চায়। এটি কোনো শান্তি স্থাপন বা অধিকারের বিষয় নয়। তাই পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকার যেন কঠোরভাবে সন্ত্রাস দমন করে, এটাই সাধারণ মানুষের দাবি। সচেতন মহল বলছেন, পাহাড়ি জনগণকে বুঝতে হবে যে, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর আস্থা রাখা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে যারা ছছিনিমিনি খেলছে, সেই আঞ্চলিক দলগুলোকে এখন বর্জন করার সময় এসেছে। কারণ সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা মারা গেলেও মূল নেতারা নিরাপদেই অবস্থান করছেন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।