পাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?

পাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?

পাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

পার্বত্য চট্টগ্রাম আবারও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। টানা বর্ষণ, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও নদীর পানি বৃদ্ধি হাজারো মানুষকে গৃহহীন করেছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে, কোথাও খাদ্যসংকট, কোথাও বিশুদ্ধ পানির অভাব, আবার কোথাও চিকিৎসাসেবার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে দেখা গেলেও, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের জনগণের প্রতিনিধিত্বের দাবি করা বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও উপজাতি নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পাহাড়ি জনগনের একটি প্রতিনিধিদল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং স্বীকৃতি সম্পর্কিত কতিপয় দাবি পেশ করেন। সরকার সদ্য স্বাধীন দেশে নতুন করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি মেনে না নেওয়ায় ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) গঠিত হয় এবং পরবর্তীকালে এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী আত্মপ্রকাশ করে এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়। শান্তিবাহিনী নামক এই সামরিক সংগঠনটি পার্বত্য অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলে ঘটতে থাকে একের পর এক গণহত্যা, অপহরন, চাঁদাবাজি , ধর্ষনের মতো ন্যাক্কারজনক কাজ। দীর্ঘ সংঘাতের পর পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আজ থেকে প্রায় ২৯ বছর আগে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পিসিজেএসএসের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির লক্ষ্য ছিল সংঘাতের অবসান, উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।

টানা বর্ষণে রাঙামাটির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, আশ্রয়কেন্দ্রে চার হাজারের বেশি মানুষপাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?

শান্তি চুক্তির পর ৭২ টি ধারার মধ্যে অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করেছে সরকার, কিন্তু সন্তু লারমা শান্তি চুক্তির পর রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিলেও পাহাড়ে শান্তি আনার বদলে পর্দার আড়ালে অশান্তি সৃষ্টি করেই চলছে। দেশের ৬১ জেলার মানুষ রাতের শেষে নিজ ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের কাছে সেই নিশ্চিন্ততা এখনো অধরা। স্থানীয় মানুষ নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি নিয়ে দিন কাটায়। বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং নারীর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ ওঠায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। অনেকের মনে আশঙ্কা কাজ করে—কখন কে অপহরণের শিকার হবে, কার কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হবে, কিংবা কখন কোনো সহিংস ঘটনার শিকার হতে হবে। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে ব্যাহত করছে।

প্রায় তিন দশক পরও পার্বত্য অঞ্চলে সম্পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করা কঠিন। বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড এবং সশস্ত্র সংঘর্ষের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় কখনো পিসিজেএসএস, কখনো ইউপিডিএফ, আবার কখনো অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাম বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। বাস্তবতা হলো, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণ।

পাহাড়ধসে সাময়িক বন্ধ বান্দরবান-কেরানীহাট সড়ক, অপসারণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসপাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?

সাম্প্রতিক দুর্যোগ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যখন পাহাড়ের বহু পরিবার খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার জন্য সংগ্রাম করছে, তখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগছে—যারা বছরের পর বছর পাহাড়ের অধিকার, স্বায়ত্তশাসন কিংবা জনগণের কল্যাণের কথা বলে রাজনীতি করেন, চাঁদাবাজি করেন এই সংকটকালে তাদের দৃশ্যমান উদ্যোগ কোথায়?

শান্তি চুক্তির সুফল ভোগ করে সন্তু লারমা বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসম পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকেও নেতৃত্ব দেন। এই সন্তু লারমা সরকারের কাছ থেকে পাহাড়ে বসবাসকৃত নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙ্গালীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর একটি বড় অঙ্কের বাজেট পেয়ে থাকেন। কিন্তু আজ পাহাড়বাসী বন্যায় ভাসছে এবং প্রাণ যাচ্ছে পাহাড় ধ্বসে, অনেকেই হচ্ছে গৃহহীন, খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন। নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করছে তারা। পাহাড়ে যখন এরুপ ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে তখন জেএসএস প্রধান তথা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা, ইউপিডিএফ প্রধান প্রসীত বিকাশ খীসা এবং কেএনএফ প্রধান নাথান বম’রা কোথায়? কোথায় স্বঘোষিত রাজাকার ত্রিদিব রায়ের পুত্র দেবাশীষ রায়? জুম্ম জাতির মুক্তির কথা বলে পাহাড়ি জনগনের কাছ থেকে জোর করে প্রতিবছর যে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি আর খাজনা আদায় করে সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? নিজেকে নির্যাতিত দাবি করা হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামী মাইকেল চাকমা কিংবা মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো ইয়েন ইয়েন আজ কোথায়? পাহাড়বাসীর এই দুর্দিনে কেন তারা এক কানাকড়িও সহায়তা দিচ্ছে না? পাহাড়িদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কষ্টার্জিত টাকাগুলো দেবাশীষ রায় খাজনা আদায়ের নামে লুটেপুটে খাচ্ছে। তিনি তো তার প্রজাদের এই দুর্দিনে একটা ফুটো পয়সাও দিলেন না। তারা নাকি স্বপ্নের জুম্মল্যান্ড গঠনের জন্য, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা তো এক মুঠো চাল নিয়েও অসহায় দুঃস্থদের মাঝে সাহায্যের হাত বাড়ালো না।

সাংগু-মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি, প্লাবিত বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল; আশ্রয়কেন্দ্রে সাধারণ মানুষপাহাড়বাসীর দুর্দিনে কথিত উপজাতি নেতারা কোথায়?

আঞ্চলিক পরিষদ, বিভিন্ন পাহাড়ি রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা প্রভাবশালী নেতৃত্বের কাছ থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা ছিল। স্থানীয় জনগণের একাংশ মনে করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হয়। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আরেকটি প্রশ্নও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যুগের পর যুগ ধরে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জোরপূর্বক সাধারন মানুষের কাছ থেকে হাজার কোটি চাঁদা আদায় করছে। তবে সেই অর্থ কি কখনও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা জরুরি সহায়তায় ব্যয় হয়েছে?

পাহাড়ের মানুষ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, নিরাপত্তা চায়; সংঘাত নয়, শান্তি চায়; বিভাজন নয়, উন্নয়ন চায়। তারা চায় এমন নেতৃত্ব, যারা শুধু অধিকার আদায়ের ভাষণ দেবেন না, দুর্দিনে মানুষের ঘরে খাবারও পৌঁছে দেবেন। নেতৃত্বের মূল্যায়ন হয় সংকটকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, কথিত অধিকারের কথা বলে নয়।

পাহাড়ি নেতারা চাঁদার টাকা দিয়ে নিজের পরিবারসহ বিলাসবহুল অট্টালিকায় জীবন-যাপন করছে। নিজের ছেলেমেয়েদেরকে বিদেশে পাঠিয়ে বানাচ্ছে উচ্চশিক্ষিত, আর পাহাড়ের সাধারণ মানুষগুলোকে বানিয়ে রাখছে অশিক্ষিত। তারা তাদের কথিত অধিকারের বুলি ছেড়ে এভাবেই বছরের পর বছর লুটেপুটে খাচ্ছে পাহাড়বাসীর অধিকার, যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসের পথে।

আজ পাহাড়ের মানুষ একটি উত্তর খুঁজছে, দুর্দিনে তাদের প্রকৃত অভিভাবক কে? যারা বছরের পর বছর জনগণের নামে রাজনীতি করেন, নাকি যারা নীরবে বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান?

পাহাড়ের পাহাড়ি-বাঙ্গালি যুব সমাজকে জেগে উঠতে হবে, ভন্ড, মুখোশধারী ও স্বার্থপর এসব কথিত উপজাতি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে এখনি জেগে না উঠলে সারাজীবন এভাবেই তাদের মায়াজালে আটকে নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে, আর অকালে প্রাণ দিতে হবে জেএসএস-ইউপিডিএফ-কেএনএফ সন্ত্রাসীদের হাতে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *