ফেনীর বন্যা দুর্ভোগে ১,৫৪২ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন, সেনাবাহিনীতে আস্থা মানুষের

ফেনীর বন্যা দুর্ভোগে ১,৫৪২ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন, সেনাবাহিনীতে আস্থা মানুষের

ফেনীর বন্যা দুর্ভোগে ১,৫৪২ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন, সেনাবাহিনীতে আস্থা মানুষের
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিনিধি 

বর্ষা মৌসুম এলেই ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার আতঙ্কে থাকেন ফেনীর লাখো মানুষ। দীর্ঘদিনের সেই দুর্ভোগ কমাতে সরকার অনুমোদন দিয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি বৃহৎ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ বাস্তবায়িত হলে জেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রকল্প অনুমোদনের পরও স্থানীয়দের একটি অংশ কাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অতীতে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজে নানা অনিয়মের অভিযোগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ বাস্তবায়নেরও প্রস্তাব দিয়েছেন।

এখনও তাজা ২০২৪ সালের বন্যার স্মৃতি

২০২৪ সালের আগস্টে ভয়াবহ বন্যায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধ ভেঙে জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, সদর ও সোনাগাজী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই দুর্যোগে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, নতুন প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে ৩ লাখ ৭১ হাজার টনের বেশি কৃষিপণ্য এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা বন্যার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে।

স্বচ্ছ বাস্তবায়নের দাবি

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম শামীম বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই মানুষ আতঙ্কে থাকে। অতীতে একাধিকবার বাঁধ সংস্কার করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এবার প্রকল্পটি যেন গুণগত মান বজায় রেখে বাস্তবায়ন করা হয়, সেটিই মানুষের প্রত্যাশা।

স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকদেরও একই ধরনের মত। তাদের ভাষ্য, প্রতি বছর ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দেখতে চান।

সেনাবাহিনীতে আস্থা

প্রকল্প অনুমোদন হলেও স্থানীয়দের মনে শঙ্কা প্রথাগত ঠিকাদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ হলে তা আবার নিম্নমানের বা দুর্নীতির কবলে পড়বে কি না।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম শামীম বলেন, বার বার বাঁধ মেরামত করা হলেও তা টেকে না। এবারও যদি আগের মতো কাজ হয়, তাহলে আমাদের দুর্ভোগ শেষ হবে না। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ হলে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হবে।

একই সুর শোনা গেলো কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের কণ্ঠেও। তারা বলেন, তারা আর প্রতিবছর লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে চান না। তারা চান একটি স্থায়ী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাধান।

কী থাকছে প্রকল্পে?

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায়—১১.৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৬৭.৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ৮৩.৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামোর পুনর্বাসন, ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ এবং একটি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ করা হবে।

এছাড়া প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

চলতি মাসেই কাজ শুরুর পরিকল্পনা

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই প্রকল্পের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ফেনী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

এদিকে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী এবং মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণই নয়, কৃষি, মৎস্য, সেচ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করে প্রকল্পের বাস্তবায়ন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *