সামরিক নিয়োগে যুবকদের ধরে নেওয়ার কথা স্বীকার করল মিয়ানমার জান্তা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগে (কনস্ক্রিপশন) তরুণদের বাড়ি ও রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সেই অভিযোগ স্বীকার করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। জান্তা সরকারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিন থু দেশটির সামরিক-নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, সামরিক নিয়োগ এড়াতে অনেক তরুণ নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বাড়িতে অভিযান চালানো এবং চেকপোস্টে তাদের আটক করছে।
এই স্বীকারোক্তি আসে সাগাইং অঞ্চলের হকমতি টাউনশিপের এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে। ওই আইনপ্রণেতা তার নির্বাচনী এলাকায় তরুণ ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অপহরণের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির (এনইউপি) সংসদ সদস্য গন ওয়ান বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বেআইনিভাবে তরুণ ও স্কুলছাত্রদের আটক করছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেক তরুণ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, চেকপোস্টে কিংবা বাড়ি থেকে তরুণদের আটক করা কনস্ক্রিপশন আইন ও তার বিধিমালার বাইরে। আটক হওয়াদের মধ্যে শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। এসব ঘটনার কারণে হকমতি শহরে তরুণরা বসবাস করতে ভয় পাচ্ছে।
তবে উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিন থু এসব অভিযানকে বৈধ দাবি করে বলেন, যেসব ব্যক্তি সামরিক কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দেননি, তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, শহর ছেড়ে বের হওয়ার পথে বিভিন্ন চেকপোস্টে কেবল সামরিক নিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিদেরই আটক করা হচ্ছে এবং এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তাদের তালিকা সরবরাহ করে থাকে।
তিনি জানান, হকমতি এলাকায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী প্রায় ৫ হাজার পুরুষ সামরিক সেবার জন্য যোগ্য। তবে শিক্ষার্থী, বয়স্ক বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে এবং প্রতিবন্ধীদের অব্যাহতি দেওয়ায় সম্ভাব্য নিয়োগপ্রাপ্তের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারে নেমে এসেছে। এখন পর্যন্ত ওই এলাকা থেকে ৩২০ জনকে সামরিক বাহিনীতে নেওয়া হয়েছে এবং ১৬ জন সামরিক নিয়োগ এড়িয়ে গেছেন।
মিন থু, যিনি নিজেও সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল, সতর্ক করে বলেন, রাতের অতিথি তল্লাশি কিংবা চেকপোস্টে তাদের পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিয়ানমারের আইনে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এড়িয়ে গেলে তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধিতার ভান করে সামরিক দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন পুনরায় কার্যকর করে জান্তা সরকার। ওই আইনের আওতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছর বয়সী নারীদের অন্তত দুই বছর সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ নাগরিক আইনের আওতায় পড়েছেন।
এরপর থেকে জান্তা সরকার ৫ হাজার জনের ২৬টি ব্যাচের মাধ্যমে আনুমানিক এক লাখ ৩০ হাজার নতুন সদস্যকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এত নিয়োগের পরও দেশজুড়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনী জনবলের সংকটে রয়েছে।
এই আইন কার্যকর হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক তরুণ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বিশেষ করে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড সামরিক নিয়োগ এড়াতে পালিয়ে যাওয়া তরুণদের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। গত বছর থেকে সামরিক নিয়োগের আওতাভুক্ত নাগরিকদের বিদেশে যাওয়া ঠেকানোরও চেষ্টা শুরু করে জান্তা সরকার।
বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় সূত্র অভিযোগ করে আসছিল, সরকারি কর্মকর্তা এবং দালালচক্র বাড়ি, রাস্তা এমনকি দূরপাল্লার বাস থেকেও তরুণ ও ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের ধরে নিয়ে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে পাঠাচ্ছে। তবে এবারই প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সামরিক সরকার প্রকাশ্যে এই ধরনের অভিযান চালানোর কথা স্বীকার করল।
বিশেষ করে ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলোতে নিয়মিত এ ধরনের আটক ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর তরুণরা বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। এছাড়া ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে অপহরণে রূপ নিচ্ছে বলেও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।