ত্রিদেশীয় সীমান্তে আরাকান-ইউপিডিএফ-কেএনএফের ‘জোট’
![]()
জার্নাল ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সীমান্ত এখন শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম স্পর্শকাতর ফ্রন্টলাইন। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, অস্ত্র পাচারের অভিযোগ ও আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগের বিস্তার নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি করেছে নতুন উদ্বেগ।
নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্য থেকে দুর্গম সীমান্ত রুট ব্যবহার করে অস্ত্র প্রবেশের ঝুঁকি বেড়েছে। এটা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা নয়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির স্থিতিশীলতা ও দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত সংযোগস্থল ঘিরে আরাকান আর্মি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে দুর্গম পাহাড়ি করিডোরগুলো ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিবহনের সম্ভাব্য রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক সূত্র।
পাহাড়ের গহীনে ভিনদেশের সীমান্ত/জাগো নিউজ
তাদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ত্রিদেশীয় সীমান্ত এলাকা একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হতে পারে। যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের মুখে ইউপিডিএফ তাদের কৌশল পাল্টে অন্য দেশবিরোধী ও বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি ও বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের কেএনএফের সঙ্গে ইউপিডিএফের গভীর গোপন আঁতাতের খবর মিলেছে।
গত ২৮ জুন রুমা-বিলাইছড়ি সীমান্তবর্তী রেতলাং পাহাড়ে কেএনএফের ঘাঁটিতে ইউপিডিএফের উপস্থিতি ও পরবর্তীসময়ে সেনা অভিযান তাদের এই নতুন সমঝোতা প্রকাশ করে।
আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্ত সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, কৌশলগত অবস্থান মজবুত করা, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা ও যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনার জন্য এই তিন গোষ্ঠী একটি ‘ত্রিপক্ষীয় অঘোষিত অক্ষ’ গড়ে তুলেছে। এরই মধ্যে এই তিন গোষ্ঠীর মিয়ানমার-বাংলাদেশ ও ভারতের মিজোরামে অবাধ যাতায়াতের তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে তারা নতুনভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়ঙ্কর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে তিন দেশের সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছে। ভয়ঙ্কর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারত থেকে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এলাকায় এবং মিয়ানমার থেকে বান্দরবান সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারী অস্ত্রের মজুত করছে তিন সশস্ত্র সংগঠন।
সম্প্রতি পার্বত্যাঞ্চলে সরেজমিনে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়।
স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আরাকান আর্মি, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ গোপনে একজোট হয়ে কাজ করছে। এই সমন্বিত জোটের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য সীমান্ত ও মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে। এই ত্রিদলীয় আঁতাত কেবল একটি সাধারণ জোট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের মানচিত্র ও নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে দেওয়ার এক গভীর নীলনকশা।
যেভাবে গড়ে উঠলো এই ত্রিপক্ষীয় জোট
দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকা এই তিন গোষ্ঠীর আদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে তারা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। রাখাইনে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের পর আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের দিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোণঠাসা হয়ে পড়া কেএনএফ ও রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির পাহাড়ে সক্রিয় ইউপিডিএফ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক মিত্রের সন্ধান করছিল।
সূত্র জানায়, গত বছরের শেষভাগ থেকে মিয়ানমারের চিন স্টেট এবং রাখাইনের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই তিন গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই জোটের প্রধান সমন্বয়ক আরাকান আর্মি। তারা ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
পাহাড়ের গহীনে ভিনদেশের সীমান্ত/জাগো নিউজ
বিনিময়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি রুটগুলো ব্যবহার করে আরাকান আর্মির জন্য ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ ও চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করছে স্থানীয় এই দুই গ্রুপ।
অস্ত্রের জোগান ও রুট নিয়ন্ত্রণ
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হলো অস্ত্রের অবাধ চোরাচালান রুট সচল রাখা। মিয়ানমারে উৎপাদিত অবৈধ অস্ত্র ও ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এখন আরাকান আর্মির হাত ঘুরে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করছে। কেএনএফ ও ইউপিডিএফের পাহাড়ি গোপন আস্তানাগুলোকে আরাকান আর্মি ব্যবহার করছে তাদের ট্রানজিট ক্যাম্প হিসেবে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এই তিন বাহিনীর যৌথ টহল ও ক্যাম্প স্থাপনের খবর পাওয়া গেছে। ফলে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে একক কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, এক এলাকায় অভিযান হলে বিদ্রোহীরা সহজেই অন্য গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সীমান্ত পার হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
ভারতের চিকেনস নেক ও বাংলাদেশের পার্বত্য নিরাপত্তার সংকট
এই জোটের প্রভাব কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরাম ও মণিপুরের নিরাপত্তাকেও বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। কেএনএফ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভারতের মিজোরামের জাতিগত সংযোগ রয়েছে। আবার আরাকান আর্মি ভারতের কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্পের জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশি ভূখণ্ডে ইউপিডিএফ ও কেএনএফের সঙ্গে আরাকান আর্মির এই সখ্যের কারণে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, এই তিন গ্রুপ মিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন বা সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি অঞ্চলের দাবি তোলার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে লবিং করার যৌথ পরিকল্পনা করছে।
জান্তা সরকারের পতন ও আরাকান আর্মির উচ্চাকাঙ্ক্ষা
মিয়ানমারে জান্তা সরকারের পরাজয়ের পর আরাকান আর্মি এখন কার্যত রাখাইন রাজ্যের শাসক। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক করিডোর সচল রাখতে তাদের বাংলাদেশ সীমান্ত সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তারা ভালো করেই জানে, বাংলাদেশ সরকারকে চাপে রাখতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আরাকান আর্মি আসলে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর একটি স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে রাখছে।
মাইকেল চাকমাসহ অন্যদের ভূমিকা
ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির মামলায় ৮ বছরের সাজা। এক অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। যাতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বিভাগের নেতা সজিব চাকমা, কেন্দ্রীয় চিফ কালেক্টর রবি চন্দ্র অর্কিড ও আত্মগোপনে থাকা কেএনএফ প্রধান নাথান বম পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাস।
পাহাড়ের গহীনে ভিনদেশের সীমান্ত/জাগো নিউজ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এখানে সেনাবাহিনী না থাকলে হয়তো এতদিন বাংলাদেশ-ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত বলতে আর কিছুই থাকতো না। হয়তো তাদের স্বপ্নের ‘জুম্মল্যান্ড’ বাস্তবায়ন হয়ে যেত।
ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো ইউপিডিএফের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে দীর্ঘদিনের জনশ্রুতি রয়েছে। ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা, সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা, কেন্দ্রীয় সদস্য উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নতুন কুমার চাকমাসহ প্রথম সারির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশে বহু মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে ভারতে আত্মগোপনে আছেন।
সরকার ও আদালত থেকে ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতৃত্বকে একাধিকবার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও চাঁদাবাজির গুরুতর মামলায় সাজা হওয়া সত্ত্বেও সীমান্তের ওপারে বসে নিজেদের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য পরিচালনা করে যাচ্ছে তারা।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
ভূ-রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার জাগো নিউজকে বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ঢাকাকে অবিলম্বে বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে এবং সীমান্ত নজরদারিতে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই তিন গোষ্ঠীর তৎপরতা দুই দেশের জন্যই সমান বিপজ্জনক।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
তিনি বলেন, কূটনৈতিক স্তরে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে তারা বাংলাদেশের ভেতরের কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়।