৮৮ শতাংশ উপকারভোগীর ব্যাটারিতে সমস্যা, তবুও পার্বত্য এলাকায় শত কোটি টাকার নতুন প্রকল্প

৮৮ শতাংশ উপকারভোগীর ব্যাটারিতে সমস্যা, তবুও পার্বত্য এলাকায় শত কোটি টাকার নতুন প্রকল্প

৮৮ শতাংশ উপকারভোগীর ব্যাটারিতে সমস্যা, তবুও পার্বত্য এলাকায় শত কোটি টাকার নতুন প্রকল্প
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো হয়েছিল সোলার প্যানেল। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই সোলার ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়েই দেখা দেয় প্রশ্ন। প্রভাব মূল্যায়নে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ উপকারভোগী ব্যাটারি নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়েছে ব্যাটারি পরিবর্তনের। রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার ঘাটতিও রয়েছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সোলার ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

পুরোনো প্রকল্পের এমন চিত্রের মধ্যেই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৬৮৪টি বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবারো সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নেওয়া হচ্ছে ১০০ কোটি ৭৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প। অর্থাৎ আগের প্রকল্পে ব্যাটারি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরও একই ধরনের সৌরব্যবস্থা আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, আগে স্থাপন করা সোলার সিস্টেমের ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল রাখার জন্য যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, সেখানে নতুন করে শত শত বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম স্থাপনের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

পুরোনো প্রকল্পের দুর্বলতা ও স্থায়িত্বের সমস্যা যথাযথভাবে সমাধান না করে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা হলে কয়েক বছর পর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিষয়গুলো কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে আগের প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার পরিবারকে ১০০ ওয়াট-পিক ক্ষমতার সোলার হোম সিস্টেম দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পাড়াকেন্দ্র, শিক্ষার্থী নিবাস, এতিমখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে ৩২০ ওয়াট-পিক ক্ষমতার ২ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়।

এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎবিহীন এলাকার মানুষের ঘরে আলো, মোবাইল ফোন চার্জ, ছোট ফ্যান ও অন্যান্য ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। সন্ধ্যার পর দোকানপাট চালু রাখা, ছোট ব্যবসা পরিচালনা ও বিভিন্ন আয়মুখী কর্মকাণ্ডের সুযোগও তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনার সুযোগ পায়। নারীদের সেলাই, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন আয়মুখী কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। অর্থাৎ প্রকল্পটির সুফল নিয়ে প্রশ্ন নেই।

আইএমইডির মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, দুর্গম ও গ্রিডবিহীন এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণে প্রকল্পটি কার্যকর ও সময়োপযোগী ছিল। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে এই সুবিধা কতদিন ধরে রাখা যাবে, তা নিয়ে। সোলার প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও তা সংরক্ষণ ও ব্যবহারযোগ্য রাখতে ব্যাটারি, ইনভার্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সচল থাকা জরুরি। ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে গেলে দিনের বেলায় প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও রাতে সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইএমইডির মূল্যায়নে ৮৮ শতাংশ উপকারভোগী ব্যাটারি-সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত আলো না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ৭৪ শতাংশ ব্যবহারকারী। ১৮ শতাংশ বলেছেন চার্জিং সমস্যার কথা। যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছেন ১২ শতাংশ এবং কারিগরি সহায়তা না পাওয়ার কথা বলেছেন ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনের আরেক অংশে দেখা যায়, ৮৮ শতাংশ সোলার প্যানেল ভালো অবস্থায় রয়েছে। ৯ শতাংশের মেরামত প্রয়োজন এবং ৩ শতাংশ সিস্টেম সম্পূর্ণ অচল। ফলে প্যানেল ও পুরো সোলার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এমন চিত্র নেই। কিন্তু ব্যাটারি নিয়ে বিপুল ব্যবহারকারীর সমস্যা থাকা প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পুরোনো প্রকল্পের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা। প্রকল্প চলাকালে ব্যবহারকারীদের সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও চার্জ কন্ট্রোলার ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সিস্টেমগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক সংস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি।

ব্যাটারি একটি নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন করতে হয়। যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে মেরামত বা পরিবর্তনের জন্যও অর্থের প্রয়োজন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আবার কারিগরি লোকজন ও যন্ত্রাংশ পৌঁছানোও কঠিন। ফলে কোনো সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তা সচল করা সম্ভব হয় না।

এতে দরিদ্র উপকারভোগীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বিনামূল্যে বা সরকারি অর্থে পাওয়া সোলার ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য পরে যদি ব্যাটারি পরিবর্তন কিংবা বড় ধরনের মেরামতের খরচ নিজেদের বহন করতে হয়, তাহলে অনেক পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে একসময় প্যানেল স্থাপিত থাকলেও পুরো ব্যবস্থার ব্যবহারিক সুফল কমে যেতে পারে।

আইএমইডি বলছে, সোলার সিস্টেম সাধারণভাবে সন্তোষজনকভাবে কাজ করছে। তবে মেঘলা দিন ও বর্ষাকালে উৎপাদন কমে যাওয়া, ব্যবহারের মাত্রা, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা এবং ইনভার্টারের রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিষয়গুলো বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ সমস্যা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তায় নয়, বরং সেটিকে দীর্ঘদিন সচল রাখার কাঠামোয়। কিন্তু এই দুর্বলতা চিহ্নিত হওয়ার পরও নতুন করে বড় পরিসরে একই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পুরোনো প্রকল্পের এই অভিজ্ঞতার মধ্যেই নেওয়া হচ্ছে ‘পার্বত্য জেলাগুলোর বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ’ শীর্ষক নতুন প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ১০০ কোটি ৭৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। পুরো অর্থ সরকারি অর্থায়নে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৬৮৪টি বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হবে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫১৫টি বিদ্যালয়ে ৪ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল এবং ১৬৯টি বিদ্যালয়ে ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ১২টি করে সৌর ফ্যান ও ১২টি করে সৌর লাইট বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি ৫১৫টি বিদ্যালয়ে সৌরচালিত গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে। এসব নলকূপের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লকে পানি সরবরাহ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানির সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় সরকারকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে না। বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং গ্রাহকদের বিদ্যুৎ দেবে। গ্রাহকেরা সেই বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করবে। এতে সরকারের অর্থ ব্যয় হবে না, সৌরবিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষ পাবে, পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

-শামসুল আলম, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা

কিন্তু এখানেই পুরোনো প্রকল্পের অভিজ্ঞতা সামনে আসে। নতুন প্রকল্পেও বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো হবে। অর্থাৎ প্যানেলের সঙ্গে ব্যাটারি, ইনভার্টারসহ একাধিক যন্ত্রাংশ থাকবে।

নতুন প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হবে। নথি অনুযায়ী, ৫১৫টি বিদ্যালয়ে সৌর প্যানেল, সৌর পাম্প ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে ৭১ কোটি ২২ লাখ ৯ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ দশমিক ৬০৭ শতাংশ। অন্যদিকে ১৬৯টি বিদ্যালয়ে সৌর পাম্প ছাড়া সৌর প্যানেল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে ১৪ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৩৮ শতাংশ অর্থ যাবে এই খাতে। অর্থাৎ নতুন প্রকল্পের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থই সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরিতে যাচ্ছে।

প্রকল্পের নথিতে প্রকল্প শেষে সৌর প্যানেল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য সম্পদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় সরকারি রাজস্ব খাত থেকে বহনের কথা বলা হয়েছে। এবার ৬৮৪টি বিদ্যালয়ের দুজন করে শিক্ষককে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

আইএমইডি আগের প্রকল্পের মূল্যায়নে সমস্যার সমাধানে কয়েকটি সুপারিশও করেছে। দরিদ্র উপকারভোগীদের ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের ব্যয় বহনে সমস্যা হওয়ায় সম্প্রদায়ভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশও রয়েছে। এ ছাড়া পণ্যের নিশ্চয়তার মেয়াদের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সরবরাহকারীর মাধ্যমে মেরামত বা পরিবর্তনের ব্যবস্থা, পুরোনো ব্যাটারি পরিবেশসম্মতভাবে অপসারণ এবং ভবিষ্যতে সোলার মিনি-গ্রিডসহ বিভিন্ন বিকল্প ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক এরশাদ উদ্দিন আহমেদ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বিদ্যুৎবিহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও নিরাপদ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব জেলার প্রায় ৪০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। ফলে শিক্ষকরা আধুনিক শিক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন এবং সন্ধ্যা বা মেঘলা দিনে পর্যাপ্ত আলোর অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে এ সমস্যা অনেকটা দূর করা সম্ভব হবে।

এরশাদ উদ্দিন আরো বলেন, পাহাড়ি এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নেই। এতে শিক্ষার্থীরা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে থাকে। সৌরচালিত পানির পাম্পের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ করা গেলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যকর পরিবেশও তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় বৈদ্যুতিক গ্রিড ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা প্রকৌশলগতভাবে কঠিন। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরচালিত পানির পাম্প তুলনামূলক সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে। পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তি পার্বত্য অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও পানির সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

এরশাদ উদ্দিন আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্গম অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ তৈরির যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেটিও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বর্তমানে সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অননুমোদিত বা বরাদ্দহীন প্রকল্প হিসেবে রয়েছে। এ ধরনের নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ‘সবুজ পাতা প্রকল্প’ বলা হয়। এগুলো মূলত ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমের নীতিগত সম্মতি বা প্রাথমিক তালিকা। পরবর্তী সময়ে অনুমোদন পেলে প্রকল্পগুলো মূল কার্যক্রম বা ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া জরুরি। জাতীয় গ্রিডের সংযোগ দেওয়া যেখানে কঠিন, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে শুধু প্যানেল স্থাপন করলেই প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত হয় না। আগের প্রকল্পে সৌরবিদ্যুতের কারণে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা ও শিক্ষার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যাটারি ও রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যায় সেই সুফল দীর্ঘস্থায়ী করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত লুটপাটের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নানা প্রক্রিয়া ও কৌশলে কাঠামোগতভাবে এই খাত থেকে লুটপাট করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎও এর অন্যতম খাত। এখানে প্যানেল ব্যবসা, যন্ত্রপাতির ব্যবসা, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের ব্যবসাসহ নানা ধরনের ব্যবসা হয়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গ্রামেগঞ্জে রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে যেমন বারবার মাটি কাটা, মাটি ভরাট ও বিল করার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দশাও অনেকটা একই রকম হয়েছে।

‘তবে সরকার সম্প্রতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরি করেছে। এখন সেই নীতির আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়ন করা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের একটি কার্যকর ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।’

শামসুল আলম আরো বলেন, ‘এ ধরনের ব্যবস্থায় সরকারকে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে না। বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং গ্রাহকদের বিদ্যুৎ দেবে। গ্রাহকেরা সেই বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করবে। এতে সরকারের অর্থ ব্যয় হবে না, সৌরবিদ্যুৎ সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষ পাবে, পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত এই ধরনের একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু তা না করে একই ধরনের প্রকল্প বারবার নেওয়া হলে অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হবে। দেশের মানুষ এখন বুঝতে পারছে, নানা ফন্দিফিকির করে এ ধরনের প্রকল্পের নামে অর্থ সরানোর অভিযোগ রয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।’

-ঢাকা মেইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *