উখিয়ার পালং গার্ডেন যেন মৃত্যুফাঁদ, দুই মাস পরপরই দুর্ঘটনা

উখিয়ার পালং গার্ডেন যেন মৃত্যুফাঁদ, দুই মাস পরপরই দুর্ঘটনা

উখিয়ার পালং গার্ডেন যেন মৃত্যুফাঁদ, দুই মাস পরপরই দুর্ঘটনা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

কক্সবাজার-টেকনাফ আঞ্চলিক মহাসড়কের উখিয়া উপজেলার পালং গার্ডেন এলাকা যেন দিন দিন অদৃশ্য এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক অংশে প্রায় দুই মাস পরপরই ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি গুরুতর আহত হচ্ছেন পথচারী ও বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ এ অংশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্ঘটনা ঘটার পর সাময়িকভাবে আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কিছুদিন পর আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায় পালং গার্ডেন এলাকা। তাদের দাবি, আরেকটি প্রাণহানির অপেক্ষা না করে এখনই ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জানা গেছে, পালং গার্ডেন এলাকা দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। পর্যটনকেন্দ্রিক যোগাযোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক যোগাযোগের জন্যও কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে এ সড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এর মধ্যে কিছু যানবাহন বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে চলাচল করায় সড়কের আশপাশে থাকা পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। স্থানীয় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত সড়ক পারাপার হতে হলেও নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রধান অভিযোগ, পালং গার্ডেন এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল অংশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে স্পিড ব্রেকার বা অন্য কোনো গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুতগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পালং গার্ডেন অংশ দিয়ে দুই দিক থেকে দ্রুতগতিতে যানবাহন চলাচল করছে। সড়কের পাশে পথচারীদের চলাচল থাকলেও যানবাহনের গতি কমানোর দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। ফলে অসতর্ক মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে আসার সময় বিপরীত দিক থেকে আরেকটি যানবাহন এলে পথচারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক সময় গাড়ির গতি বুঝে ওঠার আগেই সেটি পথচারীর কাছাকাছি চলে আসে।

পালং গার্ডেন এলাকায় দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ মঙ্গলবার একটি সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগেও এ সড়কে একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শুধু হতাহত ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের ভাষায়, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু মানেই একটি পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মৃত্যু। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত হলে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে। এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনায় অমূল্য প্রাণ ঝরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আসাদ বলেন, “এখানে প্রায়ই গাড়িগুলো খুব দ্রুতগতিতে চলাচল করে। সড়ক পার হওয়ার সময় কখন কোন গাড়ি সামনে চলে আসে, তা বোঝা কঠিন। একটি স্পিড ব্রেকার বা কার্যকর গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমতে পারে।”

পথচারী ইমাম হোসেন বলেন, “দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন সবাই বিষয়টি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। স্থায়ীভাবে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করতেই বেশি সময় চলে যায়। তাদের মতে, একটি দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষা না করে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো আগেই চিহ্নিত করা উচিত।

সচেতন মহলের দাবি, পালং গার্ডেন অংশকে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—সড়কের উপযুক্ত স্থানে স্পিড ব্রেকার বা কার্যকর গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন, যানবাহনের চালকদের সতর্ক করতে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, রাতে পথচারী ও চালকদের দৃশ্যমানতা বাড়াতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদার করা।

পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করা এবং ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কটি শুধু স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যম নয়; পর্যটন, বাণিজ্য, স্থানীয় জনগণের চলাচল এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক যোগাযোগের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। ফলে সড়কের কোনো একটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে তার প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে।

পালং গার্ডেন এলাকায় স্পিড ব্রেকার বা গতিরোধক স্থাপনের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে অবগত করা হবে।”

প্রশাসনের এ আশ্বাসে স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও তারা দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করবে এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পালং গার্ডেনের মতো দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হলে প্রথমে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান, সড়কের কাঠামো, যানবাহনের গতি, পথচারীদের চলাচল এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করা দরকার। এরপর প্রকৌশলগতভাবে উপযুক্ত গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো স্থাপন করা যেতে পারে।

তাদের ভাষায়, দুর্ঘটনা ঘটার পর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আফসোস করার চেয়ে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। পালং গার্ডেন এলাকায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আর কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জন হারানোর শোক বহন করতে না হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল এবং সার্বিক সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এটাই এখন পালং গার্ডেনবাসীর প্রধান দাবি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *