পাহাড়ে নতুন সমীকরণ: নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান বদলাতে সেনাবাহিনীর বহুমুখী উদ্যোগ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট, মৌলিক সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের স্বল্পতা। খাড়া পাহাড়, দুর্গম পথ আর বিচ্ছিন্ন জনপদের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকার মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও বাজারসুবিধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন বাস্তবতায় নিরাপত্তা দায়িত্বের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পার্বত্য অঞ্চলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবার মতো তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ও অবকাঠামোভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, কৃষিপণ্য পরিবহনের যান ও নৌযান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বসতঘর নির্মাণ—এসব উদ্যোগের লক্ষ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ ও টেকসই করা।
সেনাবাহিনীর এসব কার্যক্রমকে ‘উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি’ বা Peace through Development ধারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে পাশাপাশি রেখে স্থানীয় মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে উদ্যোগ
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় স্থানীয়দের ঝিরি, পাহাড়ি ছড়া কিংবা কুয়ার পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে পড়লে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন নারী ও শিশুরা।
এই বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রিজিয়ন ও জোনের উদ্যোগে দুর্গম এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বান্দরবানের লংলাইপাড়া ও বাকলাইপাড়া, খাগড়াছড়ির ধনপাতাছড়া, রেজামনি, কারিগর পাড়া, রসূলপুর, চিকনচান কার্বারীপাড়া, সাজেক ও বাঘাইহাট এবং গুইমারার ত্রিপুরা পাড়া ও পলাশপুরে সোলার প্যানেলভিত্তিক ও সাধারণ পানির পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাঙামাটির ইসলামপুরে পানির ট্যাংক এবং দোপানীছড়ায় পানির পাইপ সরবরাহ করা হয়েছে। গুইমারার আসালংপাড়ায় সৌরশক্তিনির্ভর নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগের ফলে দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ পানি সংগ্রহের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি দূরবর্তী স্থান থেকে পানি বহনের কষ্টও কমেছে। একই সঙ্গে অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষিপণ্য পরিবহনে নতুন সুযোগ
পাহাড়ের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকা কৃষি। পাহাড়ি ঢাল ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সময়মতো পণ্য বিক্রি করতে না পারায় কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বান্দরবানের বাকলাই পাড়ার বম সম্প্রদায়ের কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য দুটি চাঁদের গাড়ি এবং পোয়ামুহুরীতে স্থানীয়দের চলাচল ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য নৌকা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন সুবিধা তৈরি হলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ বাড়বে। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়দের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় ছোট ছোট অবকাঠামোর বড় প্রভাব
পার্বত্য অঞ্চলের অনেক জনপদে বড় সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি ছোট ছোট যোগাযোগ অবকাঠামোও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
খাগড়াছড়ির গুইমারার বাইল্যাছড়িতে সাঁকো নির্মাণের মতো উদ্যোগ দুর্গম এলাকার মানুষের চলাচল সহজ করেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এমন অবকাঠামো শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।
দুর্গম এলাকায় একটি সাঁকো কিংবা একটি নৌযানও অনেক সময় একটি পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ সহজ করে দেয়।

পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা
পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম বড় ক্ষেত্র পর্যটন। পাহাড়, ঝরনা, নদী, বন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া এই খাত থেকে তাদের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন।
বান্দরবানের সুংসাং পাড়ায় বম সম্প্রদায়ের নিজস্ব মালিকানায় রিসোর্ট নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পর্যটনের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছালে পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্ম
উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষা। দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো যেমন কঠিন, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচিত হওয়ার সুযোগও সীমিত।
রাঙামাটির দুর্গম রাইনখিয়াং পুকুর পাড়ায় শিক্ষা-বঞ্চিত শিশুদের জন্য স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ এবং খাগড়াছড়ির গুইমারার বাটনাতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কম্পিউটার ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ তরুণদের প্রচলিত কর্মসংস্থানের বাইরে নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে পাহাড়ের তরুণরা ভবিষ্যতে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন কারিগরি পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

দুর্যোগে পুনর্বাসনের উদ্যোগ
পার্বত্য অঞ্চলে বর্ষাকালে পাহাড়ধস, অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেক পরিবার। দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিক খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গুইমারার তাপ্তা মাস্টার পাড়ায় ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বসতঘর নির্মাণ এবং রাঙামাটির জুরাছড়িতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার মতো উদ্যোগ সেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ।
এ ধরনের সহায়তা শুধু তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কমায় না, বরং দুর্যোগের পর একটি পরিবারকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করে।

সামাজিক জীবনেও সহায়তা
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বান্দরবানের সুংসাং পাড়ায় সামাজিক অনুষ্ঠান ব্যবহারের জন্য সাউন্ড সিস্টেম ও প্রয়োজনীয় পানির পাইপ দেওয়ার মতো কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করছে।
ত্রাণ থেকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের দিকে
পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর মানবিক কার্যক্রমের একটি বড় পরিবর্তন হলো—তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমুখী উদ্যোগের বিস্তার।
আগে যেখানে ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা ক্যাম্প ও জরুরি আর্থিক সহায়তা ছিল প্রধান কার্যক্রম, সেখানে বর্তমানে পানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন ও পুনর্বাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে কোনো একটি পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পুরো একটি এলাকার জীবনযাত্রার কাঠামোতে পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

উন্নয়ন ও শান্তির পারস্পরিক সম্পর্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি ও যোগাযোগের সুযোগ যত বাড়বে, স্থানীয় মানুষের জীবনমানও তত উন্নত হবে।
একজন কৃষক যখন সহজে তার উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারেন, একজন নারী যখন বাড়ির কাছেই নিরাপদ পানি পান, একজন তরুণ যখন প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের সুযোগ পান কিংবা একটি দুর্গম এলাকার শিশু যখন নিজের এলাকাতেই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়—তখন উন্নয়নের সুফল সরাসরি মানুষের জীবনে পৌঁছায়।
এই জায়গাতেই নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে পাশাপাশি রেখে কাজ করার ধারণাটি গুরুত্ব পায়।

পাহাড়ের মানুষের পাশে থাকার ধারাবাহিকতা
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা ও দুর্গমতার কারণে অনেক সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গম জনপদে দ্রুত পৌঁছাতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উন্নয়ন ও মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে।
পানি, শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি, পর্যটন, পুনর্বাসন ও প্রযুক্তি—বিভিন্ন খাতে এসব উদ্যোগের বিস্তৃতি দেখাচ্ছে যে পাহাড়ে উন্নয়নের প্রয়োজন শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় মানুষের বাস্তব প্রয়োজন চিহ্নিত করে ছোট ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগও তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের পথ তাই শুধু অবকাঠামো বা নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনমান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা।
সেই বাস্তবতায় নিরাপত্তা দায়িত্বের পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এসব মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পাহাড়ের দুর্গম জনপদে উন্নয়নের একটি ভিন্ন মাত্রা তৈরি করছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ কতটা টেকসই পরিবর্তন আনতে পারে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।