ভারত থেকে আসা ৯,৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত

ভারত থেকে আসা ৯,৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত

ভারত থেকে আসা ৯,৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

ভারত থেকে সরকার টু সরকার (জিটুজি) চুক্তিতে আমদানি করা সাড়ে ১০ হাজার টন চালের চালানে ক্ষতিকর আফলাটক্সিনের উপস্থিতির সন্দেহ দেখা দেওয়ায় প্রায় ৯,৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে পচা ও খাবার অনুপযোগী ৯৮৪ টন চাল সরবরাহকারীকে ফেরত দেওয়া হলেও অভিযোগ উঠেছে—ফেরত পাঠানো ওই চাল নতুন করে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

গুরুতর এ তথ্য সামনে আসার পর খাদ্য বিভাগে তোলপাড় শুরু হয়। চালের মান যাচাই করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফা সুলতানা দীপ্তির নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল চট্টগ্রামে এসে গত ১৭ আগস্ট হালিশহর ও দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। বর্তমানে গাজীপুরে ওই নমুনার পরীক্ষা চলছে।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংগৃহীত নমুনার প্রাথমিক পরীক্ষায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে অধিকতর পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত ওই চাল বিতরণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে খাদ্য বিভাগকে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানায়, ভারত থেকে আসা চালের কিছু অংশ ঢাকার তেজগাঁও সিএসডি, চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি এবং গাজীপুরের জয়দেবপুর এলএসডি গুদামে পাঠানো হয়েছিল। চালের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ঢাকা ও গাজীপুরে পাঠানো চালের অংশও চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনা হয়।

জিটুজি চুক্তিতে আসে সাড়ে ১০ হাজার টন চাল

সূত্র জানায়, ভারত থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় এ দফায় সাড়ে ১০ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়। ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ নামে জাহাজে গত ২১ জুলাই চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। পরদিন ২২ জুলাই খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব পরীক্ষা করা হয়। তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় ‘খাদ্য উপযোগী’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর চাল খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। ২৪ ও ২৫ জুলাই দুদিনে চাল খালাস করা হয়। এরপর চালের একটি অংশ তেজগাঁও সিএসডি, হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি এবং জয়দেবপুর এলএসডিতে পাঠানো হয়। কিন্তু গুদামে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তারা দেখতে পান, চালের রঙ লালচে হয়ে গেছে। কিছু চাল ভেজা ও পচা অবস্থায়ও পাওয়া যায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়।

খাদ্য বিভাগের নির্দেশে বেশি দুর্গন্ধযুক্ত ও পচা চাল আলাদা করে রাখা হয়। চারটি খাদ্যগুদাম থেকে মোট ৯৮৪ টন খাবার অনুপযোগী চাল সরবরাহকারীর অনুকূলে ফেরত পাঠানো হয়। বাকি প্রায় ৯,৫০০ টন চাল গুদামে সংরক্ষণ করা হয়।

দ্রুত রঙ পরিবর্তন, ছড়ায় দুর্গন্ধ

গুদামে সংরক্ষণের পরও চালের রঙ দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। পাশাপাশি দুর্গন্ধও বাড়তে থাকে। এতে গুদাম কর্মকর্তাদের মধ্যে চালের মান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে বিষয়টি খাদ্য বিভাগকে জানানো হয়।

গুদাম-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অস্বাভাবিক দ্রুত রঙ পরিবর্তন ও দুর্গন্ধের কারণে চালের মধ্যে ক্ষতিকর টক্সিন থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপর খাদ্য অধিদপ্তর চালের বিতরণ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয় এবং নতুন করে কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

খাদ্য অধিদপ্তরের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক সাকিব রেজওয়ান জানান, জাহাজ থেকে চাল খালাসের সময়ই চালের নিম্নমানের বিষয়টি সামনে আসে। চুক্তি অনুযায়ী ল্যাব টেস্টের বিধান থাকলেও কেমিক্যাল টেস্টের বিধান ছিল না। এ কারণে চাল দেখে সন্দেহ তৈরি হলেও তা নিতে হয়েছে। তবে বেশি নিম্নমানের ৯৮৪ টন চাল তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহকারীর কাছে ফেরত পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, বাকি চালগুলো গুদামে সংরক্ষিত আছে এবং খাদ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে বিতরণ স্থগিত রাখা হয়। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নমুনার কেমিক্যাল পরীক্ষা চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর খাদ্য অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফারুখ হোসেন পাটোয়ারী জানান, ৯,৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত রেখে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চালের মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। সাধারণত এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সাধারণ ল্যাব টেস্টের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আমদানি করা চাল গ্রহণ করা হয়।

নমুনা পরীক্ষা চলছে

নমুনা পরীক্ষার অংশ হিসেবে গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফা সুলতানা দীপ্তির নেতৃত্বে দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম থেকে চালের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে যায়। প্রাথমিক পরীক্ষায় ওই চালে ক্ষতিকর আফলাটক্সিনের অস্তিত্ব মিলেছে বলে জানা গেছে। এখন নমুনার অধিকতর পরীক্ষা চলছে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রয়োজনে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। প্রতিবেদন প্রস্তুত হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকেই গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে।

আফলাটক্সিন কী?

আফলাটক্সিন হলো এক ধরনের জীবাণু, যা ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে। এটি কোষের ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটির গুরুতর সংক্রমণে গ্যাস গ্যাংগ্রিন/পেশির টিস্যু ধ্বংস হতে পারে। এছাড়া রক্তকণিকা ও রক্তনালির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আক্রান্ত জায়গায় ব্যথা, ফোলা ও টিস্যু ক্ষয় হতে পারে। এর থেকে সৃষ্ট সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি একাধিক অঙ্গ বিকল হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আফলাটক্সিন খাদ্যে সংমিশ্রণ ক্যানসারসহ মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগও হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি জানান, এ জীবাণু একটি বিষ। খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে। প্রাথমিকভাবে ফুড পয়জন লক্ষণ হিসেবে দেখা দেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম। বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ঝুঁকি বেশি।

ফেরত দেওয়া ৯৮৪ টন চালও ফের গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা

আলোচিত চালের চালানটি বাংলাদেশের শিপিং এজেন্ট ‘সেভেন সি শিপিং’-এর মাধ্যমে সরবরাহ করেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রো কর্পস’। ইতোমধ্যে ওই চালানের ৯৮৪ টন পচা ও নিম্নমানের চাল শিপিং এজেন্টের কাছে ফেরত পাঠানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের ও সন্দেহযুক্ত এ চাল ধ্বংস বা পুনঃরপ্তানি না করে নতুন করে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে সরবরাহের চেষ্টা চলছে। শিপিং এজেন্টের পক্ষ থেকে অন্য একটি ল্যাবে চাল পরীক্ষা করিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন নেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদন দেখিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে ফেরত দেওয়া চাল পুনরায় গ্রহণের অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, এসব চাল যেহেতু সরকারি উদ্যোগে আমদানি করা হয়, তাই চালগুলো দীর্ঘ সময় শিপিং এজেন্টের জিম্মায় রাখার সুযোগ নেই। সরকার চালের পুরো চালান বা এর কোনো অংশ গ্রহণ না করলে তা সরবরাহকারী দেশে পুনঃরপ্তানি করতে হবে। আর চালের মান নিম্নমানের প্রমাণিত হলে কাস্টমস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত ধ্বংস করতে হবে। এক্ষেত্রে দেড় মাস কালক্ষেপণের সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে ‘সেভেন সি শিপিং’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

-আমার দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *