সেনাবাহিনী আয়োজিত চিকিৎসা সেবা গ্রহনে পাহাড়িদের বাধা দিচ্ছে ইউপিডিএফ, চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মাসালং মিলনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি সাধারণ মানুষের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় আয়োজিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমে সেবা গ্রহনে স্থানীয়দের বাধা ও নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক উপজাতিভিত্তিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন ও লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং ফিনিক্সের তত্ত্বাবধানে এবং সেনাবাহিনীর সহায়তায় এ চিকিৎসা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাজেকের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে চক্ষু চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব মানুষ দূরবর্তী শহর বা উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য বা সুযোগ পান না, তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে এলাকার সাধারণ মানুষ যাতে এ সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই মাসালং মিলনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে চিকিৎসা কার্যক্রমের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
চিকিৎসা কার্যক্রমের বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্থানীয় এলাকায় লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি মৌখিকভাবেও প্রচার চালানো হচ্ছে। বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। বিশেষ করে চোখের বিভিন্ন সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে ভোগা এমন মানুষ, যাদের অনেকের পক্ষে অর্থের অভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না, তাদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ সরাসরি উপকার বয়ে আনতে পারে।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসা কার্যক্রমের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা স্থানীয় কিছু পাহাড়ি সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত স্থানে না যাওয়ার জন্য বাধা দিচ্ছেন। তাদের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণে বাধা দেয়ার পাশাপাশি অবাধ্য হলে নির্যাতনের হুমকি প্রদানেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং এ ধরনের জনকল্যাণমূলক সেবাকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মানুষ এমনিতেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। ফলে তাদের জন্য যখন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে যায়, তখন সেটি গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা বরং সবার জন্যই ইতিবাচক।

সাজেকের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ নয়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতি এবং চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষ নিয়মিত চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যান। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমের আয়োজন স্থানীয় মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন ও লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং ফিনিক্সের মতো সংগঠনের চিকিৎসাসেবাকে প্রত্যন্ত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা এ ধরনের কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোতে বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য থাকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো। চিকিৎসা সেবার মতো মানবিক কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিভাজন না করে পাহাড়ি ও বাঙালি—সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করা হলে তা স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা গ্রহণ থেকে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত বা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ সত্য হলে তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারের ওপর না পড়ে—এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যের চিকিৎসা সেবা অনেক সময় চিকিৎসা পাওয়ার একমাত্র সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সুযোগ থেকেও যদি কেউ ভয়ভীতি, বাধা বা প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন ওই সাধারণ মানুষই।
পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে ঘিরে অধিকার, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। সাধারণ মানুষকে সামনে রেখে পরিচালিত যেকোনো জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেই জনগোষ্ঠীর ওপরই। ফলে কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীর অবস্থান যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা গ্রহণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, কোনো ধরনের ভয়ভীতি, বাধা বা বিভ্রান্তিকর প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ থেকে বিরত না রেখে তাদের নিজস্ব প্রয়োজন ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। বিশেষ করে প্রবীণ, দরিদ্র ও দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভোগা মানুষদের জন্য এ ধরনের বিনামূল্যের চিকিৎসা কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১৭ সেপ্টেম্বরের এই কর্মসূচিকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চিকিৎসা নিতে আগ্রহী মানুষ যেন নির্বিঘ্নে নির্ধারিত স্থানে যেতে পারেন এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে চিকিৎসা সেবা পান। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চিকিৎসা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার স্বার্থে মানবিক কার্যক্রমকে নিজেদের স্বার্থান্বেষী অপরাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে উন্নয়ন ও চিকিৎসার সুযোগ থেকে পিছিয়ে না রেখে বরং সরকারি-বেসরকারি এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের কাছে আরও বেশি সেবা পৌঁছে দেওয়া দরকার। মাসালংয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তায় আয়োজিত এই চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম সেই প্রয়োজনেরই একটি উদাহরণ। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান দায়িত্ব।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।