বিদ্যুতের খুঁটি আছে, তারও আছে—আলো নেই আলীকদমের পাঁচ পাহাড়ি গ্রামে
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের মূল লাইন। বসানো হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটিও। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। খুঁটি আছে, তার আছে, অথচ অধিকাংশ ঘরে নেই বিদ্যুতের সংযোগ। ফলে দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেই অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো এলাকা। কারও ভরসা সোলার প্যানেল, কারও চেরাগ; আবার কোনো কোনো ঘরে মুঠোফোনের টর্চের আলোয় চলে প্রয়োজনীয় কাজ।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ৩ নম্বর নয়াপাড়া ইউনিয়নের যোগেন্দ্র পাড়া, বসুদেব পাড়া, সাইয়ে ম্রো পাড়া, রোহিনীমোহন কারবারী পাড়াসহ পাঁচটি গ্রামের চিত্র এটি। শত বছরের পুরোনো এসব পাহাড়ি পাড়ায় বসবাস করছেন তিন শতাধিক পরিবার। তাদের অধিকাংশই জুমচাষ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের সুবিধা থেকে বঞ্চিত এসব পরিবারের অনেকের ঘরের সামনে এখন বিদ্যুতের অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও ঘরের ভেতরে পৌঁছায়নি সেই কাঙ্ক্ষিত আলো।
ঘরের ভেতরে মুঠোফোনের আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় চার বছর বয়সী শিশু পমি তংচঙ্গ্যার মুখ। এক হাতে মুঠোফোন, অন্য হাতে ভাতের লোকমা। মায়ের হাত থেকে খাবার তুলে নিচ্ছে শিশুটি। অথচ ঘরের বাইরে তাকালেই দেখা যায়, মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। কিন্তু সেই তারের আলো এখনো পৌঁছায়নি ঘরের ভেতরে। আধুনিক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর এই সময়ে এমন দৃশ্য যেন পাহাড়ি জনপদের মানুষের বাস্তব বঞ্চনারই প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জিতা তংচঙ্গ্যা বলেন, গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি ও মূল লাইন এসেছে। কিন্তু সংযোগ নেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করায় তিনি সংযোগ নিতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা নেই। এত টাকা কোথা থেকে দেব? এ কারণে মোবাইলের লাইট দিয়েই থাকতে হচ্ছে।’
শুধু বসতঘর নয়, বিদ্যুতের সংযোগ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসাও। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে মাত্র প্রায় ১০০ গজ দূরে অংচিংনু তংচঙ্গ্যার ছোট্ট একটি দোকান। দুই বছর ধরে সোলারের আলো ব্যবহার করেই তিনি ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। দোকানের সামনে বিদ্যুতের খুঁটি ও মূল লাইনের তার থাকলেও তাঁর দোকানে এখনো সংযোগ পৌঁছায়নি।
অংচিংনু তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘আমার দোকান থেকে ১০০ গজ দূরে বিদ্যুতের খুঁটি ও আলো দেখা যায়। কিন্তু এখানে বিদ্যুতের লাইন বা খুঁটি দেওয়া হয়নি। বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীরা টাকা দাবি করছেন।’
সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নয়াপাড়া ইউনিয়নের এসব পাড়ায় ভোর হলেই শুরু হয় মানুষের কর্মব্যস্ততা। কেউ পাহাড়ের ঢালে জুমের কাজে বেরিয়ে পড়েন, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঘরের কাজে। দিনভর পাহাড়ে শ্রম দেওয়ার পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলেও তখন শুরু হয় তাদের আরেক সংগ্রাম—ঘরে আলো জ্বালানোর সংগ্রাম। আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চোখের সামনে থাকলেও সেই সুবিধা ভোগ করতে না পারায় রাত কাটে সোলারের ক্ষীণ আলো, চেরাগ কিংবা মুঠোফোনের টর্চে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপনের জন্য পাড়াবাসীর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে খুঁটি স্থাপন করা হয় এবং মূল বিদ্যুতের লাইনও এলাকার ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বাড়িঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শাখা-প্রশাখা লাইন স্থাপন করা হয়নি।
পাড়াবাসীর অভিযোগ, শাখা লাইন ও মিটার স্থাপনের জন্য আবারও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে এই অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় অধিকাংশ বাড়ি এখনো বিদ্যুৎ সংযোগের বাইরে রয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ২০০টি বাড়িঘরের মধ্যে মাত্র চারটি বাড়িতে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। বাকি বাড়িগুলোতে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও চেরাগই এখনো আলো জ্বালানোর প্রধান অবলম্বন। কোনো কোনো ঘরে প্রয়োজনীয় কাজ করতে মুঠোফোনের টর্চ ব্যবহার করতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ সোলারের ক্ষীণ আলোয় পড়াশোনা করছে।
যোগেন্দ্র কারবারী পাড়ার বাসিন্দা চিংচাহ্লা তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘গ্রামে বিদ্যুৎ আনতে ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে কর্মচারীদের। এরপর বিদ্যুৎ এলেও শাখা-প্রশাখা লাইন দেওয়া হয়নি। এখন শাখা লাইন দিতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাবি করছে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন। এ কারণে অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।’
আরেক বাসিন্দা রঞ্জন তংচঙ্গ্যা বলেন, ‘বিদ্যুতের মিটার আর শাখা-প্রশাখা নিতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে বলা হচ্ছে। এখানে সবাই গরিব, দিনে এনে দিনে খায়। এত টাকা কীভাবে দেবে? মাত্র চারটি বাড়িতে বিদ্যুৎ জ্বলছে। অন্য বাড়িগুলোতে এখনো সোলার ও চেরাগের আলোতে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিনও জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে যোগেন্দ্র পাড়ায় বিদ্যুতের তার নেওয়া হলেও শাখা-প্রশাখা লাইন না থাকায় অনেকেই সংযোগ নিতে পারছেন না। তাঁর কাছে স্থানীয়রা মিটার ও সংযোগ দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনের টাকা চাওয়ার অভিযোগ করেছেন বলেও জানান তিনি।
তবে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে লামা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী জাকির হোসাইন বলেন, কোনো কর্মচারী টাকা চাইলে অফিসে এসে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পাড়াবাসী সাধারণত অফিসে আসেন না এবং তিনি নিজেও এখনো ওই এলাকায় সরেজমিনে যাননি। বিদ্যুৎ লাইন বা শাখা-প্রশাখা দেওয়ার প্রয়োজন হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
কোনো কর্মচারী বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য টাকা দাবি করলে সরাসরি অফিসে এসে অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা। অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুতের অবকাঠামো নির্মাণের পরও যদি দরিদ্র পরিবারগুলো অর্থের অভাবে সংযোগ নিতে না পারে, তাহলে অবকাঠামো নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলোকে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে সংযোগের নামে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বিদ্যুৎ পৌঁছানো শুধু ঘরে আলো জ্বালানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও জড়িত। অথচ নয়াপাড়ার এসব গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি ও মূল লাইন স্থাপনের পরও অধিকাংশ পরিবার সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে উন্নয়নের অবকাঠামো চোখের সামনে থাকলেও তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না সাধারণ মানুষের ঘরে।
বিদ্যুতের খুঁটি আছে, মাথার ওপর দিয়ে বিদ্যুতের তারও গেছে—শুধু পৌঁছায়নি আলো। উন্নত জীবনের আশায় থাকা যোগেন্দ্র পাড়া, বসুদেব পাড়া, সাইয়ে ম্রো পাড়া, রোহিনীমোহন কারবারী পাড়াসহ পাঁচ গ্রামের মানুষের কাছে তাই বিদ্যুতের লাইন এখনো যেন পূর্ণতার নয়, অপেক্ষার প্রতীক। সন্ধ্যা নামলেই সোলারের ক্ষীণ আলো, চেরাগ কিংবা মুঠোফোনের টর্চে দিন কাটানো এসব পরিবারের অপেক্ষা—কবে অবকাঠামোর বিদ্যুৎ সত্যিকার অর্থে পৌঁছাবে তাদের ঘরের ভেতর।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।