বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের খবর অস্বীকার মিয়ানমার জান্তার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা দুই বছরের জন্য বন্ধ রেখে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে—এমন খবর অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার। তবে দেশটিতে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ কার্যক্রম ঘিরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি।
চলতি মাসের শুরুতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের লটারিতে নির্বাচিত তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত হলেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে। লটারিতে ১০০-এর নিচে নম্বর পাওয়া তরুণদের তিন মাসের মধ্যে ডেকে পাঠানো হবে বলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
মিয়ানমারে লটারির মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের জন্য তরুণদের বাছাই করা হয়। ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি বাক্স থেকে লটারির মাধ্যমে নম্বর তোলা হয়। যাঁরা ছোট নম্বর পান, তাঁদের আগে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয়; বড় নম্বরধারীদের পরবর্তী সময়ে ডাকা হয়।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মাসে মান্দালয় শহরে সদ্য ১৮ বছর পূর্ণ করা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও লটারিতে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। মান্দালয়ের এক মা দ্য ইরাবতীকে বলেন, উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদেরও লটারি তুলতে বলা হয়েছিল। তিনি ছেলের পক্ষে লটারি তুলে ৫০০-এর বেশি নম্বর পেয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও সেনাবাহিনীতে ডাকা হতে পারে—এমন খবরের কারণে তাঁদের ভয় এখনো কাটেনি।
গুজব অস্বীকার করে জান্তা সরকারের কেন্দ্রীয় সামরিক নিয়োগ কমিটি চলতি সপ্তাহে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনের ১৫(ক)(৩) ধারার উল্লেখ করেছে। কমিটির ভাষ্য, এই ধারায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কারণে সামরিক নিয়োগ স্থগিত রাখার সুযোগ রয়েছে। সরকারি সংবাদপত্রগুলোতেও বিষয়টি বারবার স্পষ্ট করা হয়েছে বলে দাবি করেছে কমিটি।
তবে জান্তা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকার টাউনশিপ প্রশাসনিক কার্যালয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়ে পাঠানোয় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাজধানী নেপিডো, ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো বড় শহরেও এসব তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তালিকা থেকে চশমা ব্যবহারকারী, শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা, প্রতিবন্ধী কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
গত আগস্টে জান্তা সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ে আসে। এর ফলে টাউনশিপ ও নিম্নপর্যায়ের নিয়োগ কার্যালয়ের পরিবর্তে আঞ্চলিক ও জেলা কর্তৃপক্ষ এ কার্যক্রমের দায়িত্ব নেয়। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে মান্দালয়ের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও গ্রামে নতুন করে লটারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ইয়াঙ্গুনে এখনো নতুন করে লটারি শুরু হয়নি বলে জানিয়েছে দ্য ইরাবতী।
মান্দালয়ের এক তরুণ বলেন, জনসংখ্যা বিভাগের পাঠানো তালিকা অনুযায়ী ওয়ার্ড কার্যালয় থেকে তাঁদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সবাইকে—শিক্ষার্থীসহ—লটারিতে অংশ নিতে হচ্ছে। তাঁর ওয়ার্ডেই ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর নাম তালিকায় ছিল। দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী লটারিতে ১০০-এর নিচে নম্বর পেলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হবে।
এর আগে সামরিক নিয়োগের উপযুক্ত বয়সী তরুণদের পরিবারের সদস্যরা নির্দিষ্ট মাসিক অর্থ দিয়ে নিয়োগ স্থগিত রাখার সুযোগ পেতেন। তাত্ত্বিকভাবে ওই অর্থের মাধ্যমে তাঁদের পরিবর্তে অন্য কাউকে সেনাবাহিনীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেত। তবে গত সেপ্টেম্বরে জান্তা সরকার এই বিকল্প নিয়োগের অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা বাতিল করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, লটারিতে নির্বাচিত প্রত্যেককে পাওয়া নম্বরের ক্রমানুসারে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
এদিকে লটারিতে নির্বাচিত তরুণদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্মার্ট কার্ড ওয়ার্ড কার্যালয় থেকে জব্দ করা হচ্ছে, প্রতি মাসে হাজিরা দিতে বলা হচ্ছে এবং তাঁদের যাতে পালিয়ে যেতে না দেওয়া হয়, সে জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে—এমন খবরও অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
মান্দালয়ের একজন সামরিক নিয়োগ কর্মকর্তা দ্য ইরাবতীকে বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়া আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, যেসব শিক্ষার্থী যথাযথ নথিপত্র ও ফরমের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারবেন যে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত, তাঁদের সাময়িকভাবে সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
২০১৯ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিয়োগের উপযুক্ত। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৬৩ লাখ এবং নারী ৭৭ লাখ। প্রতি দফায় প্রায় ৫ হাজার করে নতুন সদস্য নিয়োগের হিসাব ধরে এখন পর্যন্ত জান্তা সরকার প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার পুরুষকে সেনাবাহিনীতে ডেকেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনটি ২০২৪ সালে পুনরায় কার্যকর করে জান্তা সরকার। এরপর দেশটির বহু তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান। নিয়োগের নির্ধারিত কোটা পূরণে হিমশিম খেতে থাকা জান্তা সরকার যোগ্য বয়সী পুরুষদের বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর থেকে তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইয়াঙ্গুনে রাত ৮টার পর রাস্তাঘাটে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে বলে জানিয়েছে দ্য ইরাবতী। ওই সময় জান্তাপন্থী সন্ত্রাসীরা যোগ্য বয়সী তরুণদের খুঁজতে রাস্তায় ঘোরাফেরা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়ার এ প্রবণতা দ্রুত মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে অপহরণের একটি অবৈধ চক্রে রূপ নিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।