মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বৈঠক যুক্তরাষ্ট্রের, নীতির পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত সপ্তাহে জাপানের টোকিওতে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। শুক্রবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বৈঠক সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটি দ্বিতীয় দফার আলোচনা। ওয়াশিংটনের এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতি থেকে সরে এসে দেশটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী সচিব মাইকেল ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডো সফর করে। টোকিওর বৈঠকেও একই কর্মকর্তা নেতৃত্ব দেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলে যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা ছিলেন। তবে বৈঠকে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পক্ষে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
সেপ্টেম্বরের বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদল জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ওই আলোচনার পর ইয়াঙ্গুনে ফেরার সময় ২০২৬ সালের জুনে আটক হওয়া মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিলোকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছিল।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য মার্কিন নাগরিকদের নিশানা করে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা। তবে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং এ নীতিগত পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে আরও বিস্তৃত যোগাযোগের পথ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে দেশটির বিরল মৃত্তিকা খনিজ সম্পদ নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্য ইরাবতী জানতে পেরেছে, নেপিডোর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা কমানো, অর্থ পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মিন অং হ্লাইং, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জান্তা সরকারকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। এ সময় জান্তার ঘনিষ্ঠ এমন কয়েকজনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে নিজ দেশের মানুষের ওপর সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জান্তা সরকারের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ নিয়ে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী ও প্রতিরোধ আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জান্তাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) জানিয়েছে, এ যোগাযোগ নিয়ে তারা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন নয়।
দ্য ইরাবতীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এনইউজির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন মার অং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জান্তা সরকার ও বিপ্লবী শক্তি—উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। তাঁর মতে, এই সম্পৃক্ততার মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা; এর অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন কোনো পক্ষকে বৈধতা দিচ্ছে।
জিন মার অং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ইতিমধ্যে স্পষ্ট। আন্তদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো সমস্যা মোকাবিলায় দেশটি লেনদেনভিত্তিক ও বাস্তবমুখী পদ্ধতি অনুসরণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করছে। তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর শুধু মিয়ানমার নয়, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করছে ওয়াশিংটন। তাই জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্পূর্ণ নতুন কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না।
তবে মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় কারেনি বা কায়াহ রাজ্যের অন্তর্বর্তী নির্বাহী পরিষদের দ্বিতীয় সচিব বানিয়া খুং অং এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। রাজ্যটির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই পরিষদের নেতা বলেন, জান্তা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বাড়লে মিয়ানমারের ফেডারেল গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আন্দোলন আর্থিক, প্রযুক্তিগত কিংবা পরিচালনাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ আশঙ্কার পক্ষে তিনি মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির সহায়তা কমানোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন।
বানিয়া খুং অং বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর প্রশাসন সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এ কারণে জান্তা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যোগাযোগে তিনি বিস্মিত নন।
তাঁর মতে, বিদেশি সরকারগুলো এখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এবং অভিন্ন স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কোনো সরকার গণতান্ত্রিক হোক বা স্বৈরশাসনভিত্তিক—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধা থাকলে তার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা থেকেই যায়।
মিয়ানমার বিষয়ে দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে লেখালেখি করা সুইডিশ সাংবাদিক, লেখক ও কৌশলগত পরামর্শক বার্টিল লিন্টনারও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে গণতন্ত্র কখনোই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়নি। একই সঙ্গে আরও অনেক দেশ মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিতে শুরু করেছে। তাঁর মতে, নিকট ভবিষ্যতে দেশটিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন সরকার টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
এদিকে জান্তা সরকারের অধীনে মিয়ানমারের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশটি আন্তদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সুরক্ষায় পরিচালিত চীনা অনলাইন প্রতারণা চক্রগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব চক্রের লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরাও রয়েছেন; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের প্রতারণায় প্রতিবছর কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগের সমালোচনা করেছেন অলটারনেটিভ আসিয়ান নেটওয়ার্ক অন বার্মার প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক ডেবি স্টোথার্ড। তিনি বলেন, তাঁর কাছে মনে হচ্ছে, মিন অং হ্লাইংয়ের প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, আরও অপরাধ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে একজন অপরাধীকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে।
ডেবি স্টোথার্ড সতর্ক করে বলেন, জান্তা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা শুধু মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়; দেশটির বেসামরিক মানুষ এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে, যার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তদেশীয় অপরাধের বিস্তার ঘটেছে, যার শিকার হচ্ছেন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের মানুষ।
তিনি আরও বলেন, মিন অং হ্লাইংকে আলিঙ্গন করার অর্থ বিপজ্জনক একটি শক্তিকে কাছে টেনে নেওয়া। তাঁর মতে, জান্তা নেতার কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক মানবিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি বাড়িয়ে তুলছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই তারা যোগাযোগ রাখে। একই সঙ্গে দেশটিতে সহিংসতা বন্ধ করা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে তুলে ধরেছে ওয়াশিংটন।
-ইরাবতী।