রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রয়োজন আরাকানের সব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রয়োজন আরাকানের সব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রয়োজন আরাকানের সব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

লেটিশিয়া ভ্যান ডেন আসুম

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির বিরুদ্ধে আশ্রয়দাতা দেশগুলোতে বিরোধিতা বাড়ছে। ফলে আবারও আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ মালয়েশিয়া। মিয়ানমারের শরণার্থী, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মুখে দেশটির সরকার নতি স্বীকার করেছে। গত সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার ৫ হাজার শরণার্থীকে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একটি বিতর্কিত সমঝোতায় পৌঁছায়, যা জাতিসংঘ বা এর শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার সমর্থন পায়নি। ভারত ও ইন্দোনেশিয়াতেও রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে।

১৯৭০ ও ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে গেলেও ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হয়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর নতুন করে প্রত্যাবাসন উদ্যোগ শুরু হয়। প্রথমদিকে চীনের মধ্যস্থতার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এ প্রচেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এবার সেই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে মালয়েশিয়াও।

গত এক দশকে প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক উদ্যোগের উদ্যোক্তা ভুলভাবে ধরে নিয়েছেন যে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেই কার্যকর সংলাপ ও সংঘাতের সমাধান সম্ভব। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীলতার মূল প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করে। প্রশ্নটি হলো, দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এবং বৈচিত্র্যময় অঞ্চল ও জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কীভাবে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বণ্টিত হবে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জান্তা সরকার দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকাংশের জন্মভূমি রাখাইন রাজ্য, যাকে আরাকান নামেও ডাকা হয়, সেখানেও জান্তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। রাজ্যটির ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র তিনটিতে বর্তমানে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অথচ এখনো সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।

বর্তমান মিয়ানমার একটি পরিবর্তনশীল রাষ্ট্র, যেখানে একাধিক কর্তৃপক্ষের হাতে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এসব কর্তৃপক্ষ কয়েক দশক ধরে কার্যকর, আবার কোথাও ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব জাতিগত ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের বিরোধী নয়। তাদের আপত্তি এমন একটি ফেডারেল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে সংবিধানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ প্রভাব বজায় রাখে।

এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারে এমন কোনো নতুন ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে কি না, যেখানে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তে বিদ্যমান ও নতুনভাবে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষগুলোর বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ পথে দীর্ঘ সময় লাগবে, তবে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অগ্রগতির লক্ষণ স্পষ্ট।

আরাকান এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) ও এর সশস্ত্র শাখা আরাকান আর্মির (এএ) আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে বাড়তে থাকায় সংগঠনটি স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন কাঠামো গড়ে তুলে একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষে রূপ নিচ্ছে। চিয়াং মাইভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সেখানে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠছে। তবে দ্রুত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ফলে জনগণের প্রত্যাশা এবং প্রশাসনের সেবা দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ, আরাকান এখনো যুদ্ধক্ষেত্র। প্রায় প্রতিদিনই আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে স্থলযুদ্ধ চলছে। পাশাপাশি বাংলাদেশভিত্তিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঘটনাও ঘটছে। মিয়ানমারের বিমানবাহিনীও আরাকানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত ওজনের বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে স্কুল, বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও উপাসনালয়। সাম্প্রতিক বড় ধরনের বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাকানের সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। আরও ২০ শতাংশ মানুষ এ ধরনের দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বর্তমানে রাজ্যটির জনসংখ্যা ২৪ লাখের কিছু বেশি বলে ধারণা করা হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়েরের (ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তখন আরাকানে প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা অবশিষ্ট ছিলেন। এরপর আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসায় বর্তমানে সেখানে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সময় লাগবে—এ বিষয়টি স্পষ্ট। সশস্ত্র সংঘাত চলতে থাকলে এবং তাদের পালিয়ে আসার মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে শরণার্থীদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য ইউএলএ/এএ এবং রোহিঙ্গাসহ আরাকানের সব জনগোষ্ঠীকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। তবে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিভক্তি, বিশেষ করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন, ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেখকের মতে, এসব পক্ষের কয়েকটিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট সরকার বিভাজন সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশলেও ব্যবহার করেছে।

আরাকানের সংকট বহুমাত্রিক। এর সমাধানে এমন একটি বৃহত্তর পরিচয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যেখানে অন্তর্ভুক্তি ও সমতাকে স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ আরাকান গড়ার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

এই উপলব্ধি থেকেই ২০১৬-১৭ সালে সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন পরামর্শক কমিশন আরাকানের সব জাতিগোষ্ঠীর বৈধ অভিযোগ, বঞ্চনা ও দুর্ভোগ নিরসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। এর মূল লক্ষ্য ছিল এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে আরাকানের সব সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সংগত, সম্প্রীতিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবে। ২০১৮ সালে কমিশন মিয়ানমারের জটিল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি পৃথক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২১ সালে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির নির্বাচিত সরকারকে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করার পরও কমিশনের সুপারিশগুলোর প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায়নি। কমিশন আরাকানের সংকটকে তিনটি প্রধান ভাগে চিহ্নিত করেছিল—নিরাপত্তা সংকট, অর্থনীতি ও উন্নয়ন সংকট এবং মানবাধিকার সংকট। এসব সংকট এখনো বিদ্যমান। ফলে আরাকানের সব জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে সমাধানের একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলার ভিত্তি হিসেবে প্রতিবেদনটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার পরিষদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রতিবছর আনান কমিশনের প্রতিবেদনকে পুনরায় স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে ২০২৪ সাল থেকে আরাকানের অধিকাংশ এলাকা ইউএলএ/এএর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর, প্রতিবেদনটি কীভাবে স্থানীয় জনগণের কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আরাকানের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়া জটিল হবে। কারণ, এখানে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করা বহু পক্ষ জড়িত। আরাকান স্টাডিজ সেন্টার গত আগস্টে প্রকাশিত ‘দ্য ডিলেমা অব হার্ড চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিভিন্ন পক্ষের বৈচিত্র্যকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দায়িত্ব গ্রহণের প্রশ্ন। বিভিন্ন রাষ্ট্র, সশস্ত্র গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নিজেদের সীমিত কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলেও সামগ্রিক দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর দায় চাপায়।

এ ধরনের ভিন্নমুখী স্বার্থের মধ্যেও আনান কমিশনের প্রতিবেদন সংলাপের একটি গ্রহণযোগ্য সূচনা হতে পারে। কমিশনের সুপারিশগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই অতিরিক্ত নির্দেশনামূলক করা হয়নি। কমিশনের ধারণা ছিল, শাসনব্যবস্থা ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলো বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা দেবে, আর বিস্তারিত বিষয়গুলো সংলাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যাবে। প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, চলাচলের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব, স্বাস্থ্যসেবা, বিচার পাওয়ার অধিকার, আন্তসম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের বিষয়ে মোট ৮৮টি সুপারিশ রয়েছে।

তবে সংলাপের ভিত্তি শুধু আনান কমিশনের প্রতিবেদন হতে পারে না। ২০১৭ সালের পর আরাকানের পরিস্থিতিতে যেসব পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংস সংঘাতের শিকার কারা? রোহিঙ্গারা যে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু আরাকানের অন্যান্য জনগোষ্ঠী—রাখাইন, মারামাগি, ম্রো, চিন, হিন্দু এবং অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের দুর্ভোগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

লেখকের মতে, এসব জনগোষ্ঠীও সহিংসতার শিকার। তাদের গ্রাম বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হয়েছে, চিকিৎসাকেন্দ্র, স্কুল ও জীবিকার অবলম্বন নষ্ট হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এমন এলাকায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যেখানে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন। কিন্তু তাদের দুর্ভোগ তুলনামূলকভাবে কম নথিবদ্ধ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগও কম পেয়েছে। আরাকানের সব জনগোষ্ঠী যে কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার—এ বাস্তবতার স্বীকৃতি পুনর্মিলনের প্রথম ধাপ হতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও ক্ষতির মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে, সেটিও স্বীকার করতে হবে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকটের মধ্যে মাটিতে কী ঘটছে, তা নিরপেক্ষভাবে জানা কঠিন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। আরাকান কিংবা বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরগুলোতে কী ঘটছে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা রয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের সুযোগের অভাব এবং ইন্টারনেট সংযোগে বাধা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

২০১৭ সালের পর থেকে আরাকান ও বাংলাদেশে কী ঘটেছে, তা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা থাকলেও আরাকানের অন্যান্য জনগোষ্ঠী সম্পর্কে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন উদ্বেগজনক অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। শরণার্থীশিবিরগুলোর জনগোষ্ঠীর ওপর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? তাদের অস্ত্র ও কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন কোথা থেকে এসেছে? বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য কীভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পারাপার করতে পারছেন—এসব প্রশ্নেরও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান দরকার।

২০১৮ সাল থেকে ইন্ডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম) মানবতাবিরোধী নৃশংস অপরাধের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের পথ সুগম করতে প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে আসছে। তবে সংস্থাটি এসব তথ্য শুধু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতের তদন্তকারী, কৌঁসুলি এবং বিচারিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগ করে। ফলে বিপুল পরিমাণ তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়। এ ছাড়া সত্য অনুসন্ধান, অপরাধের প্রকাশ্য স্বীকৃতি, সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত আর্কাইভ তৈরির মতো বৃহত্তর উদ্যোগ আইআইএমএমের কাজের পরিধির অন্তর্ভুক্ত নয়।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

এসব সীমাবদ্ধতা থেকে বোঝা যায়, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অতীতের অপরাধের সত্য উদ্‌ঘাটন এবং পুনর্মিলনের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ উদ্যোগকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে—যার লক্ষ্য হবে আরাকানের সব জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

আনান কমিশনের প্রতিবেদনকে সংলাপের বিশ্বাসযোগ্য সূচনা হিসেবে ব্যবহার করা হলে আরাকানের সব জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও প্রত্যাশা সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রতিবেদনটির বারবার স্বীকৃতি এ উদ্যোগের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করতেও সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি রয়েছে।

মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতী থেকে নেয়া। লেখক লেটিশিয়া ভ্যান ডেন আসুম নেদারল্যান্ডসের সাবেক কূটনীতিক। তিনি কফি আনানের নেতৃত্বাধীন ২০১৬-১৭ সালের রাখাইন পরামর্শক কমিশনেরও সদস্য ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *