বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ’: মিয়ানমারের জান্তা প্রতিরক্ষামন্ত্রী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মিয়ানমারে বেসামরিক স্থাপনায় সামরিক জান্তার বিমান হামলা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনা সত্ত্বেও এসব হামলাকে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করেছেন দেশটির নবনিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়ার পিয়ে। তাঁর এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন জান্তা বাহিনী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে।
গত ১৬ অক্টোবর দেশটির রাজধানী নেপিদোতে দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি চুক্তির (এনসিএ) ১১তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালার সমাপনী বক্তব্যে ইয়ার পিয়ে বলেন, গণমাধ্যমে বোমা হামলা নিয়ে যেসব প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই মানবাধিকার ও মানবিক উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান সামরিক অভিযানগুলো আসলে শান্তি অর্জনের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ। ইয়ার পিয়ে জান্তা সরকারের জাতীয় সংহতি ও শান্তি আলোচনা কমিটির (এনএসপিএনসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরোধ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার মাধ্যমে জান্তাবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম দুর্বল করা এবং তাদের সরকারের কথিত শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে বাধ্য করাই সামরিক বাহিনীর কৌশল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর শান রাজ্য ও মান্দালয় অঞ্চলে এ কৌশলের কিছু সাফল্য পেয়েছে জান্তা বাহিনী। সেখানে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাদের মিত্র তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মিকে (টিএনএলএ) লড়াই বন্ধ করতে, চীনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে এবং দখলে নেওয়া কয়েকটি শহর ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বর্তমানে রাখাইনসহ মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চল ও রাজ্যেও একই ধরনের চাপ অব্যাহত রেখেছে জান্তা বাহিনী। রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণে, যারা এমএনডিএএ ও টিএনএলএর মিত্র।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর আরাকান আর্মি-নিয়ন্ত্রিত কিয়াউকতাও শহরের জনবহুল ভারতীয় বাজারে বিমান হামলা চালায় জান্তা বাহিনী। ওই হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হন। ঘটনাটি জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তীব্র নিন্দার মুখে পড়ে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির বিভিন্ন প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও বেসামরিক মানুষের বাড়িঘরও হামলার শিকার হয়েছে। মধ্য মিয়ানমারের আনিয়ার অঞ্চল, যা ‘ড্রাই জোন’ নামেও পরিচিত, এবং বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাও এসব হামলার আওতায় রয়েছে।
একদিকে জান্তা সরকার শান্তি আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে কাচিন রাজ্যের ভামো এলাকায় কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) সঙ্গে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষও অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে—মধ্য মিয়ানমারের আনিয়ার অঞ্চলেও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চলছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই গত ১৫ অক্টোবর নেপিদোতে এনসিএর ১১তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং ‘নিঃশর্ত শান্তি আলোচনার’ আমন্ত্রণ জানান বলে দাবি করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি পিডিএফসহ দেশের প্রধান সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সমর্পণ করে আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন।
এনসিএ বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালার সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মিকে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আরাকান আর্মিকে এ ধরনের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়নি।
এদিকে ১৫ অক্টোবর মিন অং হ্লাইং বলেন, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো (ইএও) রাজনীতি করতে চাইলে তাদের অস্ত্র ত্যাগ করে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। ব্যবসা করতে চাইলে আইন মেনে তা করতে হবে। আর প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হতে চাইলে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে (বিজিএফ) যোগ দিতে হবে।
২০০৯ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে বিজিএফে রূপান্তরের জন্য ব্যাপক চাপ দিয়েছিল। তবে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ওই উদ্যোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘাতে লিপ্ত কেআইএ ছিল সেই সময় বিজিএফে রূপান্তর হতে অস্বীকৃতি জানানো অন্যতম প্রধান সশস্ত্র সংগঠন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘বসন্ত বিপ্লবের’ সময় জান্তাবিরোধী পিডিএফ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়ায় কেআইএর ওপর ক্ষুব্ধ হয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।
একইভাবে, ‘অপারেশন ১০২৭’-এর পর আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ শহর এবং একটি আঞ্চলিক সামরিক কমান্ড সদর দপ্তরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয়। এরপর হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে রাজ্যটিতে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে জান্তা বাহিনী।
পিডিএফকে আত্মসমর্পণ এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে বিজিএফে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি এনসিএর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া জাতিগত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মিন অং হ্লাইং বলেন, যারা শান্তির জন্য একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করবেন। আর যারা সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন পদ্ধতি খোঁজা হবে বলেও জানান তিনি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।