দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথে ভারত–চীন, তবু রয়ে গেছে জটিলতা

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথে ভারত–চীন, তবু রয়ে গেছে জটিলতা

দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথে ভারত–চীন, তবু রয়ে গেছে জটিলতা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পূর্ব লাদাখের গালওয়ান সংঘর্ষের পর টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ভারত–চীন সম্পর্ক ২০২৫ সালের শেষে এসে নতুন করে কূটনৈতিক গতিশীলতা পেয়েছে। দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে সংলাপ ও যোগাযোগ বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় গতি আসে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে, যখন দুই পক্ষ লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) বরাবর দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অচলাবস্থা নিরসন ও সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য এটিকে একটি প্রধান শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছিল। এরপর থেকেই দুই দেশের জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা ও বৈঠকের সংখ্যা বেড়েছে।

সীমান্ত ইস্যুতে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই একাধিক দফা বৈঠক করে ধাপে ধাপে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা করেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে চীন সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, সীমান্তে সেনা প্রত্যাহারের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় সমাধানের পথে এগোতে হবে।

এদিকে আগস্টে তিয়ানজিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে দুই নেতা ভারত ও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে দেখার কথা বলেন। তাঁরা মতপার্থক্যকে বিরোধে পরিণত না করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পারস্পরিক সম্মান, স্বার্থ ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে স্থিতিশীল সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। মোদি স্পষ্ট করেন, তৃতীয় কোনো দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারত–চীন সম্পর্ককে দেখা উচিত নয়। সূত্র জানায়, ২০২৬ সালে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে।

২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরের বেশি সময় পর তিব্বতের কৈলাস–মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু হয়েছে, ভিসা বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে এবং সরাসরি বিমান চলাচলও আবার চালু হয়েছে।

তবে এসব অগ্রগতির মাঝেও একাধিক জটিলতা রয়ে গেছে। মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালে পাকিস্তানকে চীনের সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ তোলে নয়াদিল্লি। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের দাবি, ওই পরিস্থিতি বেইজিং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল, যদিও চীন সরাসরি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

নভেম্বরে আরেকটি ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হয়, যখন জাপানগামী এক ভারতীয় নাগরিককে সাংহাই বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। ভারত সরকার এর প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের ‘নির্বাচিতভাবে হয়রানি’ না করার নিশ্চয়তা চায়। চীন অভিযোগ অস্বীকার করলেও অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে তাদের দাবির পুনরাবৃত্তি করে, যা ভারত প্রত্যাখ্যান করে জানায়—অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এ ছাড়া বিরল খনিজ (রেয়ার-আর্থ) রপ্তানিতে চীনের বিধিনিষেধ ভারতীয় শিল্প, বিশেষ করে অটোমোবাইল খাতে প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা এলেও ভারতের জন্য তা আংশিক পর্যায়েই সীমিত রয়েছে।

বাণিজ্য খাতে দুই দেশের লেনদেন বেড়েছে, তবে ভারসাম্যহীনতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়ে গেছে। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে চীনে ভারতের রপ্তানি ২২ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভারতে চীনের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় কর্মকর্তারা এই অগ্রগতিকে সীমিত বলে উল্লেখ করে চীনা বাজারে অধিক প্রবেশাধিকার দাবি করেছেন।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চীন রাশিয়া–ভারত–চীন (আরআইসি) ত্রিপক্ষীয় ফোরাম পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাবও দিয়েছে। দুই দেশই সম্পর্কের গতি ইতিবাচক বলে ইঙ্গিত দিলেও কৌশলগত পার্থক্য ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আগামী দিনেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকদের মত।

প্রসঙ্গত, গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত–চীন সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

You may have missed