টেকনাফ স্থলবন্দর: আরাকান আর্মির কমিশন বনাম নাফের নাব্য সংকট

টেকনাফ স্থলবন্দর: আরাকান আর্মির কমিশন বনাম নাফের নাব্য সংকট

টেকনাফ স্থলবন্দর: আরাকান আর্মির কমিশন বনাম নাফের নাব্য সংকট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত বাণিজ্য নতুন করে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি শুরুর  আলোচনা এরই মধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। তবে নতুনভাবে আবার সামনে আসছে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সীমান্ত বাণিজ্যের কমিশন। টেকনাফ স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে সীমান্ত বাণিজ্যের ভাগ চাইবে তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির সীমান্ত বাণিজ্যের কমিশন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাবনায় রাখতে হচ্ছে।

টেকনাফকেন্দ্রিক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি-রপ্তানি চালু হলে আরাকান আর্মিকে ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের। কী কৌশল ব্যবহার করে ব্যবসা চালু এটা ঠিক করবেন তারা। নিজ দেশের সশস্ত্র সংগঠনকে কমিশন দিয়ে ব্যবসা করতে হলে সেই দেশের ব্যবসায়ীদের তা পরিশোধ করতে হবে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের এই বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ হয়েছে।

তবে সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, স্থলবন্দর চালুর মধ্য দিয়ে যাতে আরাকান আর্মি বৈধভাবে রড ও সিমেন্ট না পায়– এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের মতামত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে  জানিয়েছে। বন্দর চালু হলেও রড-সিমেন্ট রপ্তানি বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ আরাকান আর্মি এসব দিয়ে বাঙ্কার তৈরির সুযোগ পাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন করা গেলে আরাকান আর্মি রাখাইনে যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এ বিষয়ে তাদের ওপর চাপ রাখতে হবে। চলমান বাস্তবতায় মিয়ানমার সরকার চাইলেও আরাকান আর্মির সবুজ সংকেত ছাড়া রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিজ মাটিতে ফেরত পাঠানো কষ্টসাধ্য।

এদিকে টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি প্রস্তাবও এসেছে। আরাকান আর্মির প্রভাব নাফ নদের বাংলাদেশ অংশ খনন করার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নাফ নদের বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকা পলি পড়ে অগভীর হওয়ার কারণে এই রুটে চলাচলকারী জলযানের স্বাভাবিক চলাচলে বেগ পেতে হয়। নাব্য সমস্যা দূর করা গেলে নির্বিঘ্নে জলযান চলাচল সহজ হবে।
প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ টেকনাফ স্থলবন্দর। বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে পণ্যবোঝাই ট্রলার বা জাহাজ নাফ নদে প্রবেশ করলে আরাকান আর্মির গুলি চালানো বা জাহাজ আটক করার ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ৩ মার্চ থেকে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ আছে।

এদিকে দীর্ঘদিন পর টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর দাবি করেছেন কক্সবাজারের ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন টেকনাফ স্থলবন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও কার্যকর ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি আগারগাঁওয়ে সভা হয়েছে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান সম্প্রতি টেকনাফ স্থলবন্দর পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শিগগিরই টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করা হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হবে। বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।

টেকনাফ স্থলবন্দরের বিষয়ে ঢাকায় যে বৈঠক হয়েছে সেখানে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বন্দর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে কার্যক্রম শুরু হবে। সবাই চিঠির অপেক্ষায় আছেন।

আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, মংডু আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আছে। আরাকান আর্মিকে কীভাবে ম্যানেজ করবে, সেটি মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা দেখছেন। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করি কোনো সমস্যা হবে না। এ ছাড়া নাফ নদ খনন করার প্রস্তাব দেয়েছি আমরা। সম্ভাব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত আসবে হয়তো। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের জায়গা হলো বন্দর চালু না থাকায় আমদানি-রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ। টেকনাফের ব্যবসায়ীদের ৯০ লাখ ডলার মিয়ানমারে আটকা আছে।

পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত সমকালকে বলেন, নাফ অভিন্ন নদ হওয়ায় এটি খনন করতে গেলে মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে এগোতে হবে। তাদের বলতে হবে, কী কারণে আমরা নদ খনন করতে চাই– এই তথ্য আমরা তাদের জানাতে পারি। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয় আবার পলি পড়ে। তখন প্রয়োজনে নদী খনন করতে হয়। দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন যে নদনদী থাকে, সেগুলোর গতিপথ অনুসরণ করা ছাড়াও মাঝামাঝিভাবে সীমানা চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন এমন দুইজন বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যতগুলো বাধা রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো আরাকান আর্মি। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পক্ষ হয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল রোহিঙ্গারা। পরে রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। নতুনভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা। দীর্ঘদিন পর টেকনাফ স্থলবন্দর চালু হলে আরাকান আর্মির ওপর থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার চাপ না কমে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

অন্য একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পর আরাকান আর্মি রাখাইনে তাদের নির্বিঘ্নে বসবাসের সুযোগ তৈরিতে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না– এমন ভাবনা থেকেও স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এক বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তের অংশের প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। সীমান্তে মিয়ানমারের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। তাই নাফ নদে মিয়ানমারের অংশ ও স্থল সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় আরাকান আর্মি সতর্ক অবস্থানে। এক পর্যায়ে গত বছর নাফ নদে মিয়ানমার অংশে নৌ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা। এর প্রভাব পড়ে টেকনাফকেন্দ্রিক সীমান্ত বাণিজ্যে। প্রায়ই বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

টেকনাফের স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন বলেন, নাফের নাইক্ষংদিয়া অংশে সবচেয়ে বেশি পলি পড়েছে। এই নদ খননের ব্যবস্থা নিতে আমরা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। নাফ নদে বাংলাদেশের অংশে খনন হয়নি কখনও। সমীক্ষাও করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করতে আমরা প্রস্তুত। আমদানি-রপ্তানি চালু হলে এটি জমজমাট হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, অনেক দিন ধরেই সীমান্তের এই এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যে কোনো সশস্ত্র গ্রুপ কমিশন চাইবে। আরাকান আর্মি তাই করছে।

মিয়ানমার থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য এসেছিল ৭৮ হাজার ৫২৭ টন। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আসে এক লাখ ৯৯ হাজার ২২৫ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গেছে এক হাজার ৪০৮ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে তিন হাজার ৫২৩ টন পণ্য। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের কাঠ, হিমায়িত মাছ, শুকনো সুপারি, পেঁয়াজ, আদা, শুঁটকি, নারকেল, আচার প্রভৃতি পণ্য আমদানি হয়। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে যায় আলু, প্লাস্টিক পণ্য, সিমেন্ট, তৈরি পোশাক, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস ও কোমল পানীয়।

নাফ নদের পশ্চিম পাড়ে টেকনাফ ও পূর্ব অংশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু। নদের মোহনায় শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ। নদের দৈর্ঘ্য ৬৩ কিলোমিটার ও গড় প্রস্থ ১৩৬৪ মিটার। এটি সর্পিলাকার নদ।

-সমকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *