পর্যটন নির্ভর কক্সবাজারে বেড়েছে অপরাধ, জনমনে আতঙ্ক

পর্যটন নির্ভর কক্সবাজারে বেড়েছে অপরাধ, জনমনে আতঙ্ক

পর্যটন নির্ভর কক্সবাজারে বেড়েছে অপরাধ, জনমনে আতঙ্ক
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

দেশের প্রধান পর্যটননগরী কক্সবাজারে অপরাধ কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বেড়েছে। হরহামেশা খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয় জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি এপ্রিলেই হাফ ডজনের বেশি হত্যাকাণ্ড ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য জেলার ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। পর্যটন এলাকায় পর্যটক হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও চাঁদাবাজি জননিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জনবল সংকটের মধ্যেও অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। তবে বেপরোয়া অপরাধীদের উৎপাতে পর্যটননির্ভর এ জেলার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন গভীর উদ্বেগের মুখে।

কক্সবাজার জেলার সদর, টেকনাফ, পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় অপরাধের বিস্তার এখন দৃশ্যমান। চুরি, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো ঘটনাও বেড়ে যাওয়ায় জনজীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে জেলা পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে।

পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, “গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে প্রায় শতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। জনবল বৃদ্ধির দাবিতে স্থানীয়দেরও সোচ্চার হতে হবে।”

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের মধ্যেই জেলায় অর্ধডজনের বেশি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে জমি সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব এবং অপহরণের পর হত্যা এ ধরনের কারণগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে পিএমখালীর পরানিয়া পাড়ায় যুবক মুবিনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা, খুরুশকুলের পাহাড়ি এলাকায় মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধুর লাশ উদ্ধার এবং কলাতলীতে টমটম চালক শওকত আলম হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় কিছু সন্দেহভাজন আটক হলেও একাধিক ঘটনায় মূল আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এরই মধ্যে টেকনাফের বাহারছড়ার উত্তর শিলখালী দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো জেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় প্রায়ই অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে, অথচ কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার অভাবে ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছে।

গত মার্চ ও জানুয়ারির ঘটনাগুলোও এখনও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। গত ২৪ মার্চ কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্পস পশ্চিম বড়ুয়াপাড়ায় মাদাকাসক্ত ছেলের হাতে মা খুন, পুলিশ অবশ্য হত্যাকারীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে আটক করে। ২৫ মার্চ রাতে সমুদ্রসৈকতের কবিতা চত্বর পয়েন্ট এলাকায় ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলম হত্যার ঘটনা কিংবা ১০ জানুয়ারি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে আসা খুলনার সাবেক কাউন্সিলর গোলাম রব্বানীকে সীগাল পয়েন্টে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলার অবনতির ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম হেলাল উদ্দিন বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় অপরাধ প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। খুন, অপহরণ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ধারাবাহিক ঘটনা প্রমাণ করছে যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে।”

তিনি আরও বলেন, “একটি পর্যটননির্ভর জেলার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু জনজীবনকেই অস্থির করে তুলছে না, বরং দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ খোকা বলেন, “পর্যটননগরী কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি বাড়ার পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করছে। যে দলই ক্ষমতায় আসে, তাদের নাম ব্যবহার করে কিছু অসাধু চক্র বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না, যা সরকারের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর।”

তিনি আরও বলেন, “অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো মূল সমস্যাগুলো সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও গবেষক রাফি আল ইমরান বলেন, “কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে ১০ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস একটি বড় সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত কর্মসংস্থান, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং খাদ্য সংকট এই বাস্তবতাগুলো অনেককে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপরাধ বিজ্ঞানের স্ট্রেইন থিওরি অনুযায়ী, বৈধ পথে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে কিছু মানুষ অবৈধ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়, যার প্রতিফলন আমরা এখন কক্সবাজারে দেখতে পাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “এলাকায় ড্রাগ ট্রাফিকিং, মানবপাচার, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং অস্ত্রনির্ভর অপরাধ বেড়েছে। কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মিয়ানমার সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়া এবং সমুদ্রপথে অবৈধ চলাচলের সুযোগ থাকায় এটি অপরাধী চক্রের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি নজরদারির ঘাটতি এসব কর্মকাণ্ডকে আরও সহজ করে তুলছে।”

তিনি যোগ করেন, “পুলিশ-জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা এবং পাহাড়, সমুদ্র ও সমতলের সমন্বয়ে গঠিত জটিল ভূপ্রকৃতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত কৌশল ছাড়া এখানে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা কঠিন। সব মিলিয়ে সামাজিক চাপ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং সংগঠিত অপরাধচক্র এই চারটি উপাদান একত্রে কক্সবাজারে অপরাধ বৃদ্ধির একটি জটিল ও বহুমাত্রিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”

পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, বেশ কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে অগ্রগতি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা গেছে। কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব অনেক অপরাধের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই সমন্বিত ও পরিকল্পিত বিশেষ অভিযান চালানো হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *