ইরানে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’ কি শেষ হয়ে গেল?

ইরানে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’ কি শেষ হয়ে গেল?

ইরানে ভারতের ‘চাবাহার স্বপ্ন’ কি শেষ হয়ে গেল?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আবারো গভীর জটিলতার মুখোমুখি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। এবারের বিরোধের কেন্দ্রে ইরানের চাবাহার বন্দর, যেখানে ভারত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থ, কূটনীতি এবং কৌশলগত প্রচেষ্টা ঢেলে দিয়েছে। ভারতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পটি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। চাবাহারের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারতকে যে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ গত ২৬ এপ্রিল শেষ হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন থেকে সেই ছাড় নবায়নের কোনো ইঙ্গিতও নেই। একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারত্ব, অন্যদিকে দশকের পর দশক ধরে লালিত ভূ-কৌশলগত স্বপ্ন—এ দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রাখা এখন নতুন দিল্লির জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

চাবাহার বন্দর ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত। বন্দরটিতে দুটি টার্মিনাল আছে। শহিদ কালান্তারি এবং শহিদ বেহেশতি। ভারত মূলত শহিদ বেহেশতি টার্মিনালে কাজ করে আসছে। ইতিমধ্যে সেখানে ১২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে নয়া দিল্লি। গত দুই দশক ধরে বন্দরটি ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। যার কারণ মূলত ভৌগোলিক অবস্থান। ভারত ও স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের প্রতিবেশী ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান। ইসলামাবাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে স্থলপথে আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানো ভারতের জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চাবাহার সে সমস্যা থেকে ভারতকে মুক্তি দেয় বিকল্প সামুদ্রিক পথের মাধ্যমে। ইরানের বন্দর থেকে ইরানের পশ্চিম উপকূলে এবং সেখান থেকে সড়ক ও রেলপথে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পণ্য পাঠানোর এ পথটি ভারত গত এক দশকে বারবার সফলভাবে ব্যবহার করেছে।

পাশাপাশি চাবাহার হলো আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের দক্ষিণ প্রান্ত। এই সাত হাজার দুইশ কিলোমিটার দীর্ঘ নেটওয়ার্কটি ইরানের মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও ভারতকে রেলপথ, সড়কপথ ও সামুদ্রিক রুটে সংযুক্ত করে। অর্থাৎ চাবাহার শুধু বন্দর নয়, এটি ভারতের বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত স্বপ্নের প্রধান প্রবেশদ্বার। অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক কবির তানেজার মতে, চাবাহার মধ্য এশিয়ায় ভারতের সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেই অঞ্চলটি ভারতের জন্য সহজলভ্য নয়। এ বন্দর এবং সংযুক্ত করিডোর ইরানের সঙ্গে মূল বিনিয়োগের সুযোগ এবং এমন ভূগোলে প্রবেশাধিকার দেয়, যেখানকার দেশগুলো তাদের সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যপথ বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে।

চাবাহার ভারতের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান চীনের অর্থায়নে নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদর উদ্বোধন করে, যেটি ওমান উপসাগরের মুখে অবস্থিত। বন্দরটি বাণিজ্যিক হলেও সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে উদ্বিগ্ন ভারত। ভারতের আশঙ্কা ছিল যে গোয়াদরকে কেন্দ্র করে চীন একদিন সামুদ্রিক সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পাবে এবং সেটা ভারতের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে। চাবাহার সেই চিন্তার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করেছে। কারণ এটি গোয়াদর থেকে মাত্র একশ চল্লিশ কিলোমিটার পশ্চিমে, এটিও গভীর সমুদ্রবন্দর। চাবাহারে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখে ভারত কার্যত গোয়াদরকে ভূ-কৌশলগতভাবে পাশ কাটানোর এবং নিজের সামুদ্রিক প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ রেখেছিল।

ভারত ও ইরান প্রথম ২০০৩ সালে এ বন্দর উন্নয়নে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু তার পরপরই শুরু হওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সব অগ্রগতি থমকে যায়। ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির পর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে আলোচনা আবার প্রাণ ফিরে পায়। ২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তেহরান সফর করেন এবং তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সাথে বৈঠক করে চাবাহার বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সঙ্গে পঞ্চাশ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরান চুক্তি থেকে বের হয়ে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সুবাদে চাবাহারের জন্য বিশেষ ছাড় পেয়েছিল নয়া দিল্লি। তখন আফগানিস্তানে মার্কিন-সমর্থিত সরকার ছিল এবং ভারতের মাধ্যমে পাঠানো মানবিক সাহায্যের দরকার ছিল, তাই ওয়াশিংটন রাজি হয়েছিল। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে, যা প্রায়ই সীমান্ত সংঘাতে রূপ নেয়। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য চাবাহারের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়, কারণ আফগানিস্তানে প্রবেশের অন্য সব পথ কার্যত বন্ধ।

পরিস্থিতি আবার জটিল হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে, যখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন চাবাহারসহ ইরান-সম্পর্কিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞার ছাড় বাতিল করার ঘোষণা দেয়। ভারত কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সেই ছাড়ের মেয়াদ ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়। ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

জানা গেছে, ভারত সরকার ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবালের চাবাহার ফ্রি জোনের অংশীদারিত্ব একটি ইরানি সংস্থার কাছে হস্তান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন এমন হস্তান্তর ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবার বন্দর পরিচালনায় ফেরার পথ খোলা রাখতে পারে। এটি মূলত ভবিষ্যতের সুযোগের জন্য দরজা খোলা রাখার কৌশল।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, গত কয়েক বছরে চাবাহার সত্যিই ভারতের জন্য ব্যর্থ বাজি হয়ে উঠেছে। সেই অর্থে এটি এখন ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ। পরবর্তীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে ভারত এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে, কিন্তু ইরানে যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনার কারণে সম্পর্কটি চরম জটিলই থাকবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

কুগেলম্যান বলেন, চাবাহার বন্দর নিয়ে এগিয়ে গেলে ভারতকে কঠিন নিষেধাজ্ঞার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়ানো ভারতের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়বে। সর্বোত্তম পরিস্থিতিতে ভারত দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের পথ ধরবে এবং পরে চাবাহার বন্দরে ফেরার সুযোগ খুঁজবে।

তবে নয়া দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক পলিসি পার্সপেক্টিভ ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো আনোয়ার আলম বলেন, ‘চাবাহার নিয়ে ভারতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তার অগ্রাধিকারের ওপর। চাবাহার থেকে বেরিয়ে না গিয়েও নিষেধাজ্ঞা সামলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে ভারত। কিন্তু চাবাহারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেয়ে যদি ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে খুশি রাখাটাই ভারত সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে প্রস্থানই একমাত্র পথ।’

আল জাজিরা অবলম্বনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *