রামগড়ে ভ্রাম্যমান আদালতের উপর হামলার পর এডিএমের দৌড়ঝাঁপ: প্রশ্নের মুখে তদন্ত, আড়ালে বালু সিন্ডিকেট

রামগড়ে ভ্রাম্যমান আদালতের উপর হামলার পর এডিএমের দৌড়ঝাঁপ: প্রশ্নের মুখে তদন্ত, আড়ালে বালু সিন্ডিকেট

রামগড়ে ভ্রাম্যমান আদালতের উপর হামলার পর এডিএমের দৌড়ঝাঁপ: প্রশ্নের মুখে তদন্ত, আড়ালে বালু সিন্ডিকেট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

ডেস্ক রিপোর্ট

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড়ে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপর হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হলেও, সেই তৎপরতা নিয়েই এখন উঠছে একাধিক প্রশ্ন। সংঘর্ষের পরপরই গতকাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি মূল্যায়নে মাঠে নামেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. হাসান মারুফ। কিন্তু তার বৈঠকের ধরন, অংশগ্রহণকারী নির্বাচন এবং বাস্তবতা যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

গতকাল মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রামগড় পৌরসভা মিলনায়তন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৃথক দুইটি মতবিনিময় সভা করেন এডিএম। এতে উপস্থিত ছিলেন রামগড় পুলিশের সার্কেল এএসপি উবাইন, থানার ওসি মোহাম্মদ নাজির আলম, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. হাফেজ আহম্মদ ভূঁইয়া, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জসীম উদ্দীন, পৌর বিএনপির সভাপতি মো. বাহার উদ্দিনসহ বিএনপি নেতারা।

এডিএম বিএনপি নেতাদের সাথে বৈঠকে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীমের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে রাতেই খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।

May be an image of offroad vehicle

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—যেখানে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাধারণ মানুষ, আনসার সদস্য ও প্রশাসনের লোকজন, সেখানে কেন আহত গ্রামবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী বা বালু মহালের শ্রমিকদের সঙ্গে কোনো সরাসরি মতবিনিময় হয়নি? কেন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাইয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের সাথেই সীমাবদ্ধ থাকলো আলোচনা?

স্থানীয়দের অভিযোগ, রামগড়ে অবৈধ বালু উত্তোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে। বিশেষ করে লামকু পাড়া, থানা চন্দ্রপাড়া, খাগড়াবিল, ওয়াফই পাড়া এবং পূর্ব বলিপাড়া এলাকা এই অবৈধ কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি সিন্ডিকেটের প্রভাবে এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে বালু তোলা বা পাহাড় কাটা হচ্ছে না। প্রতিদিন অন্তত ৫০টি ট্রাক চলাচল করে, ফলে গ্রামীণ সড়ক ভেঙে পড়ছে এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

No photo description available.

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের অভিযানের পর কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও গত দেড় মাস ধরে আবার নতুন করে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে—আর সেই কার্যক্রমের পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।

গতকালের সংঘর্ষকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তিকর নানা ‘ন্যারেটিভ’। বিএনপি নেতা-কর্মীদের অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রশাসন ‘নিরীহ কৃষকদের’ ওপর গুলি চালিয়েছে। এমনকি স্থানীয় বিএনপি-যুবদলের নেতারা কৃষক সেজে গণমাধ্যমের সামনেও প্রশাসনকে নিয়ে নেতিবাচক তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। যেখানে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠী নিজেদের কার্যক্রম আড়াল করতে সাধারণ জনগণকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে।

ঘটনার পর প্রশাসন দ্রুত তৎপরতা দেখালেও, তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে—কেন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেই পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা করা হলো? অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা এখনো কেন নেওয়া হয়নি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান কী?

তবে এবিষয়ে তাৎক্ষনিক জেলা প্রশাসকের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রামগড়ের এই ঘটনা শুধু একটি সংঘর্ষ নয়; এটি প্রশাসন, রাজনীতি ও অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জটিল এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যদি দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

স্থানীয়রা বলছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, পরিবেশ রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, এমন সংঘর্ষ আবারও ঘটতে পারে—আর তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

খাগড়াছড়িতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে সন্ত্রাসী হামলা: ৩ আনসার সদস্যসহ আহত ৮

এর আগে, গতকাল উপজেলার পূর্ব বলিপাড়া এলাকায় প্রশাসনের অভিযানকালে বালু উত্তোলকারী ও শ্রমিকদের সাথে প্রশাসনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ইউএনও, ওসিসহ উভয়পক্ষের ১১ জন আহত হয়েছে। পাল্টাপাল্টি এ হামলার ঘটনায় ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়ে আনসার ও পুলিশ।

মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুর সাড়ে ৩ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

হামলায় অপর আহতরা হলেন, রামগড় উপজেলা প্রশাসনের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল ওহাব, আনসার সদস্য নুর মোহাম্মদ, মো. সালাহ উদ্দীন, গাড়ি চালক কামাল হোসেন, অফিস সহকারী জয়নাল আবেদীন এবং স্থানীয় যুবক আজাদ, সুমন ত্রিপুরা, নুর হোসেন ও আবুল হোসেন। হামলার সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার গাড়ির সামনের গ্লাস ভাংচুর করা হয়।

রামগড় থানার ওসি মোহাম্মদ নাজির বলেন, উপজেলা প্রশাসন একটি বালু মহলে অভিযান পরিচালনা করে ৫ থেকে ৬ টি বালু তোলার মেশিন ধংস করে। ফেরার পথে আমাদের উপর অতর্কিত হামলা করা হয়। পরে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়।

রামগড় উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা কাজী শামিম বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে রামগড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাচ্ছিলেন। এমন তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ব বলিপাড়া এলাকায় অভিযানে গেলে দেখতে পান দুই কিলোমিটারের এলাকা জুড়ে একাধিক স্থানে ৩০-৪০ ফুট গর্ত করে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলেছে একটি চক্র। ঘটনাস্থল থেকে বালু তোলার পাইপ জব্দ করা হয়। পরে ফেরার পথে তাদের উপর হামলা করা হয়। অবৈধভাবে বালু তোলার সাথে জড়িতরা এ হামলা চালায় বলে জানিয়েছেন ইউএনও।

তবে ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। আহত গ্রামবাসী দেলোয়ার, সুমন ও নুর হোসেনের দাবি, প্রশাসন কৃষকদের সেচের পাম্প মেশিন ভেঙে দিলে তাঁরা প্রতিবাদ করেন, তখনই গুলি চালানো হয়। কৃষক ফারুকসহ কয়েকজন একই অভিযোগ করেছেন। যদিও ইউএনও কাজী শামীম এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।

রামগড় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওবাইন জানান, বালু মহলে অভিযানে গিয়ে রামগড় থানার ওসিসহ হামলার শিকার হয়েছে। এ-সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ ও আনসার ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়ে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, রামগড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করতে গেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ওসি, ইউএনও আক্রান্ত হন। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। প্রশাসন পুরো ব্যাপারটি দেখছে। সব তথ্য যাচাই বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

অভিযানের খবর পেয়ে মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে এক থেকে দেড়শ মানুষ সংগঠিত হয়ে হামলা চালাল — এই দ্রুততাই প্রশ্ন তুলছে, পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন আছে কি না।

প্রশ্ন উঠছে, অভিযানের খবর পেয়ে মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে এক থেকে দেড়শ মানুষ সংগঠিত হয়ে হামলা চালাল কীভাবে? এই সংগঠিত প্রতিরোধই ইঙ্গিত দিচ্ছে, পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *