ইরানের হাতে এখনো রয়েছে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার, বলছে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য
![]()
নিউজ ডেস্ক
ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে দাবি করছে যে ইরানের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ঠিক এর উল্টো কথাই বলছেন দেশটির গোয়েন্দারা। চলতি মাসের শুরুর দিকের কিছু গোপন গোয়েন্দা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইরান ইতিমধ্যে তাদের বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি, লঞ্চার ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।
জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। এই প্রণালি বরাবর থাকা ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই আবার সচল হয়েছে। এর ফলে ওই সরু নৌপথে চলাচলকারী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলের ট্যাংকারগুলো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
গোয়েন্দা পর্যালোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, ক্ষতির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে ইরানিরা চাইলে ঘাঁটির ভেতরে থাকা মোবাইল লঞ্চারগুলো দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা সরাসরি ওই স্থাপনাগুলোর লঞ্চপ্যাড থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান এখনো সারা দেশে তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার সচল রেখেছে। পাশাপাশি যুদ্ধপূর্ববর্তী ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশই তারা ধরে রাখতে পেরেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (যা দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা করা যায়) এবং স্বল্প দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
স্যাটেলাইট ছবি ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তির ভিত্তিতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, সারা দেশে থাকা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র গুদাম ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণই আবার ফিরে পেয়েছে ইরান। এগুলো এখন ‘আংশিক বা পুরোপুরি কার্যকর’ বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্প ও হেগসেথের দাবির উল্টো চিত্র
এই গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া আশ্বাসের পুরো বিপরীত। তারা আমেরিকানদের বলে আসছিলেন যে ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘গুঁড়িয়ে’ দেওয়া হয়েছে এবং তারা ‘আর কোনো হুমকি নয়’।
গত ৯ মার্চ ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে বলেছিলেন, ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তছনছ হয়ে গেছে’ এবং ‘সামরিক দিক দিয়ে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই’। অন্যদিকে ৮ এপ্রিল পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ দাবি করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য তাদের আর যুদ্ধ করার সক্ষমতা নেই।
অথচ হেগসেথের ওই সংবাদ সম্মেলনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা টিকে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
এসব গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পুরোনো দাবিই পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘গুঁড়িয়ে’ দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ‘কেউ যদি মনে করে ইরান তাদের সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন করেছে, তবে সে হয় উন্মাদ, নয়তো ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র।’
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার ট্রাম্পের দেওয়া একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কথা উল্লেখ করেন অলিভিয়া। ওই পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ভালো অবস্থায় আছে—এমন কথা বলাটা ‘ভার্চ্যুয়াল রাষ্ট্রদ্রোহের’ শামিল।
পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সেক্রেটারি জোয়েল ভালদেজ উল্টো সংবাদমাধ্যমের কড়া সমালোচনা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরিকে একটি ঐতিহাসিক অর্জনের বদলে অন্যভাবে তুলে ধরতে নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্যরা ইরানের জনসংযোগ কর্মকর্তার মতো কাজ করছে, যা সত্যিই অত্যন্ত লজ্জাজনক।’
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে টান
নতুন এই গোয়েন্দা পর্যালোচনা থেকে স্পষ্ট যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস গত মাসে জানিয়েছিল, মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ইরান তাদের যুদ্ধপূর্ববর্তী ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের ৭০ শতাংশই পুনরুদ্ধার করতে পারবে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্টও একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
এই তথ্যগুলো ট্রাম্পের জন্য নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে। এক মাস ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যদি ভেঙে যায় এবং ফের পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের বিপাকে পড়বে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীতে টমাহক ক্রুজ মিসাইল, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর এবং অ্যাটাকমসের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত ইতিমধ্যে ফুরিয়ে এসেছে। এর মধ্যেই গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, হরমুজ প্রণালিসহ অন্যান্য অঞ্চলে ইরানের সামরিক শক্তি এখনো বেশ শক্তিশালী।
ট্রাম্প যদি আবারও কমান্ডারদের ইরানে হামলার নির্দেশ দেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত থেকে আরও বেশি খরচ করতে হবে। এমন এক সময়ে এই ঘাটতি দেখা দেবে, যখন বড় অস্ত্র নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
তবে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা বারবার অস্বীকার করেছেন যে মার্কিন অস্ত্রের মজুত বিপজ্জনক মাত্রায় কমে গেছে। ইউরোপীয় মিত্রদেরও পেন্টাগন একই আশ্বাস দিয়েছে। এই মিত্ররা ইউক্রেনকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। তাদের ভয়, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো নিজেদের মজুত পূরণ করতে গিয়ে তাদের অস্ত্র সরবরাহ আটকে দিতে পারে। আর ট্রাম্প যদি আবার ইরানে হামলা শুরু করেন, তবে এই ভয় আরও বাড়বে।

কীভাবে টিকে রইল ইরানের সামরিক সক্ষমতা?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অনেক কৌশলগত স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধের চাপে অর্থনীতিও ধুঁকছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইরানের এই পারদর্শিতা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। যারা আগে থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, ট্রাম্পের সেই সমর্থকেরাও এখন কড়া সমালোচনা করছেন।
মূলত মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্তই ইরানের সামরিক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।
কর্মকর্তারা জানান, যখন মার্কিন বাহিনী ইরানের সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখন পেন্টাগনের হাতে ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ (মাটির গভীরের স্থাপনা ধ্বংসকারী) বোমার মজুত সীমিত ছিল। তাই তারা পুরো স্থাপনা ও ভেতরের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার বদলে শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই কৌশল পুরোপুরি কাজে আসেনি।
ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে কিছু বাঙ্কার-বাস্টার ফেলা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সামরিক বাহিনীকে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। কারণ, এশিয়া অঞ্চলে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য এই বোমার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুত রাখা জরুরি ছিল।
নিউইয়র্ক টাইমস এর আগে জানিয়েছিল, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ হাজার ১০০টি দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা তাদের মজুতে থাকা মোট পরিমাণের প্রায় সমান। সামরিক বাহিনী ১ হাজারের বেশি টমাহক মিসাইলও ছুড়েছে, যা পেন্টাগনের বার্ষিক ক্রয়ের প্রায় ১০ গুণ। এ ছাড়া ১ হাজার ৩০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মজুত আবার পূর্ণ করতে কয়েক মাস নয়, কয়েক বছর সময় লাগবে। লকহিড মার্টিন বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৫০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে। তারা এই উৎপাদন বাড়িয়ে বছরে দুই হাজারে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের মতে, এই কাজ মোটেও সহজ হবে না এবং ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী এত দ্রুত রকেট মোটরের উৎপাদন বাড়ানোও সম্ভব নয়।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল অবশ্য দাবি করেন, নিজেদের মিশন পরিচালনার জন্য যা যা দরকার, তার সবই সামরিক বাহিনীর কাছে আছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।