জেএসএসের হামলায় রক্তে রাঙা তাইন্দং- ১৮ মে’র বিভীষিকাময় কালরাত্রি আজও কাঁদায় বাঙ্গালিদের
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয় সেগুলো হয়ে আছে রক্ত, কান্না আর দীর্ঘশ্বাসে লেখা একেকটি কালো অধ্যায়। ১৯৮৬ সালের ১৮ মে ঠিক তেমনই একটি দিন। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়া, দেওয়ানবাজার, সিংহপাড়া ও তাইন্দংসহ বিস্তীর্ণ জনপদে নেমে এসেছিল এক ভয়াল মৃত্যুর মিছিল। পাহাড়ী সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনী পিজেএসএস কর্তৃক গভীর রাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর চালানো হয়েছিল নৃশংস হামলা। আগুনে জ্বলেছিল শত শত ঘরবাড়ি, রক্তে ভেসেছিল পাহাড়ি জনপদ, আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল পাহাড়ের আকাশ।
সেদিন রাত ছিল নিস্তব্ধ। পাহাড়ি জনপদের মানুষ সারাদিনের পরিশ্রম শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল নিজেদের ছোট্ট ঘরে। কেউ জানত না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের জীবনে নেমে আসবে ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র হামলাকারীরা। হঠাৎ গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা আর মানুষের চিৎকারে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেউ রেহাই পায়নি সেই বর্বরতা থেকে। যারা জীবন বাঁচাতে দৌড়েছে, তাদের পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে। যারা ঘরের ভেতর লুকিয়েছে, তাদের ঘরেই আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে সেদিন কেবল মানুষ হত্যা নয়, চালানো হয়েছিল পাশবিক নির্যাতনের এক নির্মম উৎসব। অনেক নারীকে পরিবারের সদস্যদের সামনে নির্যাতন করা হয়। শিশুদের পর্যন্ত রেহাই দেওয়া হয়নি। মায়ের কোল থেকে সন্তান কেড়ে নিয়ে হত্যা করার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটেছিল। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কুপিয়ে হত্যা করা হয়, অনেকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। পুরো এলাকা মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।
দেওয়ানবাজারের বাসিন্দারা আজও সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দৃশ্য যেন আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। তারা জানান, সশস্ত্র হামলাকারীরা তাদের বাড়িতে ঢুকে পুরো পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। অনেকের মেয়েকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। ছোট ছোট নাবালক শিশুদেরকেও রক্ষা করা যায়নি। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের নিথর দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সেই আর্তচিৎকার, সেই অসহায়ত্ব আজও ভুলতে পারেননি কেহ।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ জানান। বৃদ্ধ এই মানুষটির ছিল একটি ছোট্ট ঘর আর কয়েকটি গবাদিপশু। সেগুলোই ছিল তার জীবনের সম্বল। কিন্তু সেদিন রাতের আগুন সবকিছু কেড়ে নেয়। তিনি বলেন, হামলাকারীরা শুধু মানুষ হত্যা করেই থামেনি, তারা গরুগুলো পর্যন্ত গোয়ালঘরে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। এরপর পুরো বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিজের চোখের সামনে বসতভিটা ছাই হয়ে যেতে দেখেও প্রতিবাদ করার সাহস পাননি তিনি। কারণ তখন চারদিকে শুধু মৃত্যু আর আতঙ্ক।
সেই রাতের বিভীষিকা শুরু হয়েছিল আরও আগে। বিকেলে কয়েকজন কিশোর গরু চরাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালানো হয়। একজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়, অন্যরা গুরুতর আহত হয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কেউ তখনও কল্পনা করতে পারেনি, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো জনপদে নেমে আসবে এমন ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ।
রাত বাড়তেই শুরু হয় সমন্বিত হামলা। বিভিন্ন গ্রামে একযোগে আক্রমণ চালানো হয়। ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, পালিয়ে যাওয়া মানুষদের ধাওয়া করে হত্যা করা হয়। কোথাও কোথাও পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের অনেকের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই সময় সরকারি-বেসরকারি হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত নিরীহ বাঙালি প্রাণ হারায়। আহত হয় অসংখ্য মানুষ, আর হাজারো পরিবার হয়ে পড়ে গৃহহীন।
সকালের সূর্য যখন ওঠে, তখন পাহাড়জুড়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া গন্ধ। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল মানুষের দেহাবশেষ। কোথাও পোড়া হাড়, কোথাও ছিন্নভিন্ন লাশ। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজন হারানোর আহাজারিতে। কেউ খুঁজছিল সন্তানের লাশ, কেউ স্বামীর, কেউবা পুরো পরিবার হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে ছিল ধ্বংসস্তূপের পাশে।
সেদিনের সেই ভয়াবহতার সঙ্গে অনেকে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার তুলনা করেছেন। কারণ হামলার ধরন ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নির্মম। কেবল হত্যা নয়, পুরো জনপদকে আতঙ্কিত করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর এক কৌশল লক্ষ্য করা যায়। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় হাজার হাজার ঘরবাড়ি। ফলে বহু পরিবার রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। পাহাড়ের নদীগুলো যেন সেদিন রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল।
ঘটনার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করেন। নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়, বিচার ও তদন্তের আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা এলেও আজ পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘ চার দশক পার হয়ে গেলেও তারা বিচার পায়নি। অনেকেই মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্গম পাহাড়ি বাস্তবতার কারণে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
আজও তাইন্দং, কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়া কিংবা দেওয়ানবাজারের প্রবীণ মানুষরা রাতের আঁধারে হঠাৎ চমকে ওঠেন। আগুনের লেলিহান শিখা, গুলির শব্দ আর স্বজন হারানোর স্মৃতি তাদের ঘুম কেড়ে নেয়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী নয়, কিন্তু তারা বড় হয়েছে বাবা-মায়ের চোখের জল দেখে, শুনেছে হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের গল্প।
এই গণহত্যার স্মৃতি শুধু একটি অঞ্চলের নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো সময় অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা কখনো মুছে যায় না। তাই আজও নিহতদের পরিবার একটাই প্রশ্ন করে কবে হবে সেই বিচার? কবে তাদের কান্নার প্রতিধ্বনি পৌঁছাবে রাষ্ট্রের বিবেক পর্যন্ত?
এখনো বিচারের অপেক্ষায় তারা কখন সন্তুলারমার সেই অপরাধী বাহিনীর বিচার জাতির সামনে করা হবে। কখন নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সরকার?
১৮ মে’র সেই ভয়াল রাত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের কাছে কেবল একটি স্মৃতি নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের ক্ষত। যে ক্ষত আজও শুকায়নি। পাহাড়ের বাতাসে আজও যেন ভেসে আসে সেই আর্তচিৎকার, সেই আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষের গন্ধ, সেই অসহায় শিশুদের কান্না। ইতিহাসের পাতা হয়তো সময়ের সঙ্গে হলুদ হয়ে যায়, কিন্তু তাইন্দংয়ের রক্তাক্ত রাত আজও বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে, অশ্রুতে এবং ন্যায়বিচারের অপূর্ণ অপেক্ষায়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।