ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানালো পিসিসিপি
![]()
নিউজ ডেস্ক
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামালের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)। সংগঠনটি তার বক্তব্যকে ইতিহাস বিকৃত, সংবিধানবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) সকালে পিসিসিপির কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মো. জমির উদ্দিন কর্তৃক গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে পিসিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এই প্রতিক্রিয়া জানান।
তারা বলেন, গত ১৫ মে দেওয়া এক বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার দাবি করেন—বাংলাদেশে একসময় আদিবাসীরাই সব সম্পদের মালিক ছিল এবং পরে বাঙালিরা এসে ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করে নেয়। সংগঠনের মতে, একজন সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির এমন মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং তা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর।
বিবৃতিতে পিসিসিপি নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে, ফলে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তারা দাবি করেন, এ ধরনের বক্তব্য “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নেতৃৃবৃন্দ বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, বাঙালিরাই এ ভূখণ্ডের প্রকৃত ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া আর কোনো আদিবাসী নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডে কখনোই অন্য কোনো আদিবাসীর বসবাস ছিল না। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসীরা হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা ‘সান অব দ্য সয়েল’। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা কেউই এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছে।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়—পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, বম ও মারমা সম্প্রদায়ের আগমনের সময়কাল উল্লেখ করে তারা দাবি করে, বাঙালিরাই এ ভূখণ্ডের “আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র”।
ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ অনুযায়ী, চাকমারা মায়ানমারের চম্পকনগর থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে, তঞ্চঙ্গ্যারা মায়ানমারের আরাকান থেকে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এবং ত্রিপুরারা ৬৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যকা থেকে এ দেশে আগমন করে। একইভাবে বম জাতি সপ্তদশ শতকে চীনের চিনলুং এলাকা থেকে এবং মারমারা ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে মায়ানমার থেকে এ দেশে এসে আশ্রয় নেয়। অপরদিকে এই বাংলায় বাঙালিদের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ডেপুটি স্পিকারের মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ইতিহাসকে সম্পূর্ণ উল্টোভাবে উপস্থাপন করে বাঙালিদের বহিরাগত এবং উপজাতিদের আদি মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
বিবৃতিতে আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, জাতিসংঘের আইএলও (ILO) কনভেনশনের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তারা নির্দিষ্ট ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় সামরিক কার্যক্রম বন্ধের দাবি করার আইনি সুযোগ পায়। ফলে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার এবং দেশের অখণ্ডতা বিনষ্ট হওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারে। একই সাথে এর আড়ালে বিদেশী বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এবং বিদেশি মিশনগুলো গোপনে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের অপতৎপরতা ও ধর্মান্তকরণ কার্যক্রম জোরদার করার সুযোগ পাবে।
পিসিসিপি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, আমরা এই দেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডকেও বিচ্ছিন্ন হতে দেব না। এ দেশের নাগরিক হিসেবে সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার কোনো চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না।
সংগঠনটি ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে তার বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে দেশবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায় পার্বত্য অঞ্চলে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
এর আগে, ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল তার নির্বাচনী এলাকায় এক বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশে আদিবাসীরা একসময় সমস্ত সম্পদের মালিক ছিল, তারপর আমরা বাঙালরা এসে একটু একটু করে নিয়ে তাদের জায়গায় বসবাস করেছি।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।