পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলার মানুষ। লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত। অনেক স্থানে কোমর থেকে গলাসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা, ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে।
বন্যাকবলিত এলাকাগুলো ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ মানুষ এখন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ প্রতিটি উপজেলায় ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রশাসন কাজ করছে।
সাতকানিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি সাতকানিয়া উপজেলায়। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ডলু খালের বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতবাড়ি, দোকানপাট, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় কয়েক দিন ধরে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ শুকনো খাবারে দিন পার করছেন, কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর উঁচু বাড়িতে।
নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে সাপসহ বিভিন্ন বিষাক্ত প্রাণী বাড়িঘরে ঢুকে পড়ায় আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কয়েকটি অংশ এবং কেরানীহাট বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান এলাকায় তীব্র স্রোতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কিছু সময়ের জন্য বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
সাতকানিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ভয়াবহ বন্যাকবলিত হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, অনেক এলাকায় মানুষ এখনো ঘরবন্দি। রান্না করার সুযোগ নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সবাইকে সমন্বিতভাবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, দুর্গত মানুষের জন্য ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রয়েছে।
লোহাগাড়ায় উদ্ধার কার্যক্রম চলমান
লোহাগাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আমিরাবাদ ইউনিয়ন। পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে বহু এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। অনেক মানুষ এখনো বাড়িতে আটকা রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, ‘আমিরাবাদ ইউনিয়ন থেকে ৯০ জনকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। পদুয়াসহ অন্যান্য এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
বাঁশখালীতে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল, ভেঙেছে শত শত মাটির ঘর
বাঁশখালীর ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই বন্যাকবলিত। আকস্মিক ঢলে শত শত মাটির ঘর ধসে পড়েছে। ধান, চাল, আসবাবপত্র, মাছের ঘের, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য পানিতে ভেসে গেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক এলাকায় মোবাইল ফোনও চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বাহারচরা ইউনিয়নের ইলশা গ্রামের বাসিন্দা কাজী ইফাজ উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার পরিবারের একমাত্র সম্পদ ছিল ছোট একটি মাটির ঘর। সেটিও ধসে যাওয়ায় এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। আমার খোলা আকাশের নিচে বাস করা ছাড়া আর উপায় নাই। পরিবারের সবকিছু নিয়ে গেছে পানি।’
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরইমধ্যে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন বলেন, আমার অফিসিয়াল হিসেব মতে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তবে পানি এখন নামতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সব রিকোভারি হয়ে যাবে। ৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমি বলতে পারবো না। আবহাওয়া অফিস বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানাতে পারবে।
এই উপজেলার চেচুরিয়া এলাকায় গলাসমান পানির মধ্যে আট মাস বয়সী এক শিশুকে একটি বড় পাতিলে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ওই উদ্ধার অভিযান দুর্যোগে মানবিকতার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
চন্দনাইশেও তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল
চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে।
বুধবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাশিমপুর এলাকায় প্রায় দেড় ফুট উঁচু হয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও ছোট যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ধীরগতিতে যান চলাচলের কারণে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
চন্দনাইশের বাসিন্দা আবু নাসের আলিফ জাগো নিউজকে বলেন, দিন দিন বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। অনেক মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না হলে মানবিক সংকট আরও গভীর হবে।
কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা
বন্যার পানিতে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের। বহু গবাদিপশুর খাদ্য নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, পানি দ্রুত না নামলে কৃষি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা না থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনেক সময় লাগবে।
প্রশাসনের তৎপরতা
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব ত্রাণসামগ্রী পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের বন্যা ও জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও নদী খনন, খাল পুনরুদ্ধার, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তাদের মতে, শুধু ত্রাণ নয়, বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষকে প্রতি বছরই একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
লোহাগাড়া উপজেলার সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আবছার বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই সাতকানিয়ার মানুষ বন্যা ও জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন। সাময়িক ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নদী-খাল পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাঁধ সংস্কার এবং পাহাড়ি ঢলের পানি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, বন্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, খাল-নালা দখলমুক্ত রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।