১০৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে কাপ্তাই হ্রদে ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য, মাছ শিকারে প্রস্তুত জেলেরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দীর্ঘ ১০৫ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও অবমুক্ত পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেওয়া টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১০ আগস্ট মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে আবারও শুরু হচ্ছে মাছ আহরণ। দীর্ঘদিনের কর্মহীনতা কাটিয়ে হ্রদে নামার প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন রাঙামাটির হাজারো জেলে।
জেলেপাড়াগুলোতে চলছে নৌকা মেরামত, জাল বোনা ও পুরোনো জাল সংস্কারের কাজ। কোথাও নৌকায় রং করা হচ্ছে, কোথাও নতুন জাল তৈরির কাজ চলছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও এসব কাজে সহযোগিতা করছেন। দীর্ঘদিনের আয়-রোজগারহীনতা, ঋণ ও অভাব-অনটনের পর মাছ আহরণ শুরুর খবরে জেলেপল্লীগুলোতে ফিরেছে স্বস্তি ও কর্মচাঞ্চল্য।

রাঙামাটি শহরের অদূরে নতুন জেলেপাড়ার বাসিন্দা সজল দাশ ও কালাবাসি দাশ জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় নৌকাগুলো হ্রদের পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। মাছ আহরণ শুরুর সময় ঘনিয়ে আসায় সেগুলো তুলে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন তারা। নির্ধারিত সময়ের আগেই নৌকা প্রস্তুত করার চেষ্টা চলছে।
একই পাড়ার বাসিন্দা সুমী দাশ বলেন, তাঁর স্বামী নৌকা মেরামতের কাজ করছেন। স্বামীর কাজে সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি পুরোনো জাল সেলাই ও নতুন জাল তৈরির কাজে হাত লাগিয়েছেন। মাছ ধরা শুরু হলে পরিবারের কষ্ট কিছুটা কমবে—এমন প্রত্যাশা তাঁর।

দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলে পরিবারগুলোকে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। পুরান জেলেপাড়ার বাসিন্দা দয়াল দাশ বলেন, অন্যান্য এলাকায় বন্ধকালীন সময়ে জেলেদের তুলনামূলক বেশি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও রাঙামাটির জেলেরা কম সহায়তা পান বলে তাঁদের অভিযোগ। দীর্ঘ সময় আয় বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, মাছ আহরণ শুরুর ঘোষণার পর জেলেদের মধ্যে নতুন করে স্বস্তি ফিরেছে। কারণ, হ্রদে মাছ ধরা শুরু হলে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধের সুযোগও তৈরি হবে।

শুধু জেলেপাড়ায় নয়, কাপ্তাই হ্রদের অন্যতম প্রধান মাছ অবতরণকেন্দ্র রাঙামাটি বিএফডিসি ঘাটেও বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। দীর্ঘ বিরতির পর হ্রদ থেকে মাছ আসতে শুরু করলে ব্যবসা-বাণিজ্যও চাঙা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
ইতোমধ্যে মাছ পরিবহনের জন্য ড্রাম ও পল্টুন প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নৌকা ও সরঞ্জাম প্রস্তুত করার পাশাপাশি জেলেদের প্রয়োজনীয় জাল সরবরাহ করছেন।
মৎস্য ব্যবসায়ী মো. আব্দুর শুক্কুর বলেন, ব্যবসা শুরুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ড্রাম রং করা, নৌকা প্রস্তুত করা এবং জেলেদের জন্য জাল সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে চলছে। হ্রদের পানি পরিষ্কার থাকায় এবার ভালো ও বড় মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।

বিএফডিসির তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় ২৬ হাজার জেলে। এর বাইরে মাছ অবতরণ, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন আরও দেড় হাজারের বেশি শ্রমিক।
ফলে দীর্ঘ ১০৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে শুধু জেলেদের নয়, হ্রদকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও পুনরায় সচল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাঙামাটি বিএফডিসির উপব্যবস্থাপক মো. মাসুদ আলম বলেন, টানা বৃষ্টিতে কাপ্তাই হ্রদের পানি বর্তমানে পরিপূর্ণ রয়েছে। তবে পোনা মাছগুলো পর্যাপ্ত বড় না হওয়ায় মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়ানো হয়েছিল।

তিনি জানান, বর্ধিত সময়সীমা আগামী ১০ আগস্ট শেষ হবে। ১১ আগস্ট সকাল থেকে অবতরণ ঘাটে মাছ আনা শুরু হবে। এ জন্য বিএফডিসির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে মাছ আহরণ শুরুর পর প্রথম পর্যায়ে যাতে অতিরিক্ত মাছ ধরা ও মাছের অপচয় না হয়, সে জন্য মাছ অবতরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর কাপ্তাই হ্রদে আবার মাছ আহরণ শুরু হওয়ায় একদিকে যেমন জেলে পরিবারগুলোর কর্মসংস্থান ফিরছে, অন্যদিকে প্রজনন মৌসুমে মাছ সংরক্ষণের ফলে হ্রদের মৎস্যসম্পদও সমৃদ্ধ হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। ফলে আগামী দিনগুলোতে জেলেদের জীবিকা ও হ্রদের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।