শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব- ব্রি. জেনারেল আরিফুল ইসলাম

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব- ব্রি. জেনারেল আরিফুল ইসলাম

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব- ব্রি. জেনারেল আরিফুল ইসলাম
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল ডেস্ক

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

আজ রবিবার (১৬ আগস্ট) সকালে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নে ম্রো জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণে উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত ম্রো সম্মেলন-২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি

সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন আয়োজিত সম্মেলনে শান্তি ও সম্প্রীতি সুদৃঢ়করণ, শিক্ষা ও মাতৃভাষা সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, যুব ও নারী সমাজের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগ ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং ম্রো জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

রিজিয়ন কমান্ডার সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের শুরুতেই, আলীকদমের ম্রো জনগোষ্ঠীর শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতায় ম্রো ন্যাশনাল পার্টির ৭৯ জন সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হওয়া এ ঘটনা শান্তির পথে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, ম্রো সমাজের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, জনগণের সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। তিনি শান্তির সেই ইতিবাচক ধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন—তিনটি একই সুতোয় গাঁথা।” আলীকদমে ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বান্দরবান রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, আলীকদমে ম্রো কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের আবাসিকভাবে থেকে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ এ সুবিধার মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে পাহাড়ভাঙ্গা সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ক্রাঞ্চিপাড়া সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব- ব্রি. জেনারেল আরিফুল ইসলাম

রিজিয়ন কমান্ডার আরও বলেন, আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কোনো বিরোধ নেই; বরং শিক্ষিত ও দক্ষ নতুন প্রজন্মই নিজস্ব সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালীভাবে ধারণ করতে পারে।

ম্রো যুবসমাজকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি উল্লেখ করে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, যুবকদের আত্মনির্ভরশীল করতে ড্রাইভিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে মোবাইল সার্ভিসিংসহ আরও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ চালুর উদ্যোগ রয়েছে। তিনি যুবকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ গ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি, ফলদ ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নারীদের উন্নয়ন ছাড়া একটি সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে নার্সিং, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ধাত্রী/মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী ও যুবকদের নিজ নিজ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।

প্রত্যন্ত এলাকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মেডিকেল ক্যাম্প ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। হাম, রুবেলাসহ প্রয়োজনীয় টিকাদান কার্যক্রমেও সহযোগিতা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। এছাড়া প্রত্যন্ত পাড়াগুলোতে ঝিরি বা দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহের কষ্ট কমাতে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি পাড়ায় পানি পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পাড়াতেও এ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।

দুর্গম এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে রিজিয়ন কমান্ডার জানান, স্থানীয় জনগণের যাতায়াত সহজ করতে নৌযান ও চাঁদের গাড়ির স্বল্পমূল্যের পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এছাড়া কুরুকপাতার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মেন্দনপাড়া–বলাইপাড়া হয়ে প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণে কুরুকপাতা ইউনিয়নে পাঁচটি মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জরুরি যোগাযোগ, বাজারজাতকরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণ আরও সুবিধা পাবে।

মিয়ানমার সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে রিজিয়ন কমান্ডার স্থানীয় জনগণকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে কাউকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করা যাবে না। এ ধরনের কোনো ঘটনা বা সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করলে দ্রুত নিকটস্থ সেনা বা বিজিবি ক্যাম্পে বিষয়টি জানানোর জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে অবৈধভাবে কাঠ ও বালু উত্তোলন/ব্যবসা, গরু চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক পাচার, চাঁদাবাজিসহ সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে যুবসমাজকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানো সম্ভব- ব্রি. জেনারেল আরিফুল ইসলাম

এদিন সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভিন্ন পাড়া থেকে আগত ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়। প্রতিনিধিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, কৃষি, নিরাপদ পানি, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

রিজিয়ন কমান্ডার তাঁদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন শুধু নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও এর অপরিহার্য অংশ। তিনি ম্রো জনগোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-জীবিকা পরিচালনা, সন্তানদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতার মাটিতে যে শান্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, সেই শান্তির ধারাবাহিকতাকে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

রিজিয়ন কমান্ডার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বান্দরবান রিজিয়ন ও আলীকদম জোন জনগণের নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে সক্ষম করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। সকল জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, সম্প্রীতিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আলীকদম গড়ে তোলাই সম্মিলিত প্রত্যয়।

এ সময় আলীকদম জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারী, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, নারী ও যুব প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পাড়া থেকে আগত আনুমানিক ১২’শ জন ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ম্রো জনগোষ্ঠীর বিপুল ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত ম্রো সম্মেলন-২০২৬ শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়। সম্মেলনটি স্থানীয় জনগণের সমস্যা ও প্রত্যাশা সরাসরি তুলে ধরা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থা আরও সুদৃঢ় করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *