বন্যার ক্ষত পেরিয়ে মাটিরাঙ্গায় সবুজ স্বপ্ন, বাম্পার আমনের প্রত্যাশায় কৃষকেরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিভোর পার্বত্য খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার কৃষকেরা। উপজেলার মাঠের পর মাঠজুড়ে এখন শোভা পাচ্ছে রোপা আমন ধানের সবুজ চারা। সবুজ পাতার ডগায় সকালের শিশির, বাতাসের তালে দুলতে থাকা সতেজ ধানগাছ আর ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় বদলে গেছে মাঠের চিত্র। বন্যার ক্ষত ভুলে এই সবুজের সমারোহেই যেন নতুন আশার আলো খুঁজে পাচ্ছেন কৃষকেরা।
কৃষকের ক্লান্ত চোখে এখন স্বপ্ন—বন্যায় হারানো ক্ষতি পুষিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সরকারি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সহায়তায় এবার ভালো ফলনের প্রত্যাশায় আমন আবাদে মনোযোগী হয়েছেন সীমান্তঘেঁষা মাটিরাঙ্গার কৃষকেরা।
ভোরের স্নিগ্ধ নরম আলো ফুটে উঠতেই উপজেলার চড়পাড়ার দিগন্তবিস্তৃত মাঠ যেন পরিণত হয় সবুজ সমুদ্রে। যতদূর চোখ যায়, কেবল কচি ধানগাছের দোলা আর সবুজের উচ্ছ্বাস। শিশিরভেজা সেই সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে এক কৃষক পরম মমতায় পরিচর্যা করছেন তাঁর স্বপ্নের ফসল। নিবিড় যত্নে আলতো হাতে তুলে ফেলছেন জমিতে জন্ম নেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছা।
কাছেই দেখা মেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক তরুণীর। হাতে বিশেষ কাপড় জড়িয়ে তিনিও ব্যস্ত ফসলের পরিচর্যায়। ভোরের স্নিগ্ধতা, পাহাড়ি প্রকৃতি আর মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা এই দৃশ্য যেন কৃষিজীবনের এক চিরন্তন গল্প। বন্যার ক্ষত-বিক্ষত সময় পেরিয়ে নতুন করে ফসলের মাঠে মানুষের এই ফিরে আসা যেন ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে মাটিরাঙ্গায় মোট ৫ হাজার ৫১ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ধান আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া ২৯০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড এবং ২২১ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
উফশী জাতের মধ্যে বিআর-১১, বিআর-১২, ব্রি ধান-৩৯, ব্রি ধান-৪০, ব্রি ধান-৪১, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৭০, ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭২, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৭৬, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪, ব্রি ধান-১০৩ ও ব্রি ধান-১০৬ এবং বিনা ধান-৭, বিনা ধান-১২, বিনা ধান-১৭ ও বিনা-২৬ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
হাইব্রিড জাতের মধ্যে ধানীগোল্ড ৮৫ হেক্টর, হীরা-২ ৮০ হেক্টর, হীরা-৬ ৫০ হেক্টর, হীরা-৮ ৪০ হেক্টর এবং তেজগোল ৩৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় জাতের মধ্যে কালিজিরা ৮৫ হেক্টর, বিন্নি ৭০ হেক্টর, চিনিগুড়া ৩৬ হেক্টর এবং পাইজাম ৩০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম। কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় মাটিরাঙ্গার ১ হাজার ১০০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ৫ কেজি করে উফশী আমন বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশেষ পুনর্বাসন সহায়তার অংশ হিসেবে আরও ৫০০ জন কৃষককে ৫ কেজি করে আমন ধানের বীজ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তায় নতুন করে জমিতে ধান রোপণ করতে পেরে অনেক কৃষকই বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন।
খেদাছড়া এলাকার কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “বন্যায় আমাদের যে ক্ষতি হয়েছিল, তাতে আমরা প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। তবে সরকারি সার ও বীজ পাওয়ার পর নতুন করে চারা রোপণ করেছি। এখন মাঠের সবুজ চারা দেখে মন ভরে যায়।”

একই আশাবাদ ব্যক্ত করে কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, “কৃষি অফিসের সঠিক পরামর্শ আর ভালো বীজ পাওয়ায় ক্ষেত বেশ চমৎকার রূপ নিয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আশা করছি বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে ভালো ফলন পাব।”
কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকির বিষয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, “বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষকদের ঘুরে দাঁড় করাতে আমরা মাঠে নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে কৃষকদের সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “বন্যার পর কৃষকরা যেন ভেঙে না পড়েন, সেজন্য আমরা দ্রুত পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছি। বিআর, ব্রিধান, বিনাধান ও জনপ্রিয় হাইব্রিড জাতগুলোর সুষম ব্যবহারের কারণে জমিতে এবার বেশ ভালো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে মাটিরাঙ্গায় আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন নিশ্চিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন মৌসুমে সময়মতো বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে রোগবালাই ও সার ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফলে বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমিগুলো দ্রুত উৎপাদনের আওতায় এসেছে।
কৃষকদের বিশ্বাস, এবারের আমন মৌসুম তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে মাঠে দুলতে থাকা প্রতিটি সবুজ ধানগাছ শুধু একটি ফসল নয়—এটি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়, নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন এবং অদম্য পরিশ্রমের প্রতীক।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে পাহাড়ের মাটিতে কৃষকের এই সবুজ স্বপ্ন এখন ধীরে ধীরে বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা অব্যাহত থাকলে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে মাটিরাঙ্গায় আমনের ভালো ফলন হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।