যেভাবে চীনের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

যেভাবে চীনের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

যেভাবে চীনের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার সঙ্গে বিদ্রোহীদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে পাল্টে যাচ্ছে যুদ্ধের গতিপথ। ২০২৩-২৪ সালে একের পর এক শহর দখল করে সামরিক বাহিনীকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। কিন্তু এখন সেই সাফল্য অনেকটাই পেছনে ঠেলে দিয়ে হারানো শহর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো পুনর্দখল করছে জান্তা সরকার। এর পেছনে গণহারে সেনা নিয়োগ, ব্যাপক বিমান হামলার পাশাপাশি চীনের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারত সীমান্তের কাছে চিন রাজ্যের ফালাম শহর এর বড় উদাহরণ। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রায় ছয় মাসের সামরিক অভিযানের পর শহরটি ছেড়ে যায় বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরই তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

ফালাম দখলে নিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী শত শত বিমান হামলা চালায় এবং প্রায় এক হাজার সেনা নিয়ে স্থল অভিযান পরিচালনা করে। এক বছর ধরে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শহরটির পতন জান্তার জন্য বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ চিন রাজ্যের একমাত্র বিমানবন্দর ফালামে এবং শহরটি ভারত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর অবস্থিত।

এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিন রাজ্যের আরও ৩টি শহর দখল করে নেয় সামরিক বাহিনী। মে মাসের শেষ নাগাদ রাজ্যটির পুরো উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে জান্তা।

চিন ব্রাদারহুডের সদস্য সালাই উইলিয়াম চিন বলেন, ফালামের ঘটনা তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে যে কোনো শহর দখল করা এবং দীর্ঘদিন সেটি ধরে রাখা এক বিষয় নয়। শহর ধরে রাখতে প্রয়োজন জনবল, রসদ, প্রশাসন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং বিশেষ করে বারবার বিমান হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা।

চীনের চাপ ও সহায়তায় শক্তি বাড়াচ্ছে জান্তা

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতির পেছনে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং একদিকে জান্তা ও শক্তিশালী কিছু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করেছে, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ কমাতে চাপ প্রয়োগ করেছে।

ব্যাংককভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের মতে, ২০২৪ সাল থেকে গণহারে সেনা নিয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা যুক্ত হয়েছে। তাদের অনেকের প্রশিক্ষণ সীমিত হলেও বিপুল সংখ্যক নতুন সেনা সামরিক বাহিনীকে স্থল অভিযানে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি চীনের চাপেও বিদ্রোহীদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শক্তিশালী বাহিনী যুদ্ধ থেকে সরে গেছে। মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)-কে লড়াই থেকে সরিয়ে নিতে বেইজিং চাপ দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।

শুধু তা-ই নয়, মিয়ানমারের অন্যতম শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড ওয় স্টেট আর্মিকেও বিদ্রোহীদের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে চাপ দিয়েছে চীন। এর ফলে দেশজুড়ে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর গোলাবারুদের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

ডেভিসের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকেই বিমানশক্তিতে বড় ধরনের সুবিধা ভোগ করছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। বিমান ব্যবহার করে তারা একদিকে সেনাদের রসদ সরবরাহ করছে, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের অবস্থানে হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারি ও হামলায় ড্রোনের ব্যবহার এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে উন্নত সমন্বয় জান্তার সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে।

হারানো শহর পুনর্দখল

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সেনাবাহিনীর কঠোর দমন-পীড়নের পর তরুণদের একটি অংশ সশস্ত্র হয়ে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) গঠন করে। দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করা বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

২০২৩ ও ২০২৪ সালে এসব গোষ্ঠীর সমন্বিত অভিযানে সামরিক বাহিনী বহু শহরের নিয়ন্ত্রণ হারায়। কিন্তু চলতি বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।

স্বাধীন থিংকট্যাংক আইএসপি-মিয়ানমারের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনী যে ১০১টি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২২টি পুনর্দখল করেছে। সংখ্যার হিসাবে এটি হারানো শহরের মাত্র ৯ শতাংশ হলেও এসব শহরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। পুনর্দখল করা এলাকাগুলোর মধ্যে সীমান্ত অঞ্চল থেকে মধ্য মিয়ানমারের সামরিক ঘাঁটির দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগপথ রয়েছে।

গবেষক সু মন বলেন, এসব শহর পুনর্দখলের ফলে অনেক প্রতিরোধ গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বড় আকারের সমন্বিত অভিযান থেকে সরে গিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে আবার প্রতিরক্ষামূলক গেরিলা যুদ্ধে যেতে হচ্ছে।

তবে সামরিক বাহিনী এখনই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বা রাজনৈতিকভাবে নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করবে এমন সম্ভাবনা কম বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং মিয়ানমার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

বিমান হামলায় ভয়াবহ বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি

সামরিক বাহিনীর বিমানশক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসামরিক জনগণের ওপর। মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের হিসাবে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে ৫২০টি বিমান হামলা হয়েছে। এসব হামলায় ৮৭টি টাউনশিপ আক্রান্ত হয় এবং অন্তত ৩১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪১টি শিশু রয়েছে।

চিন রাজ্যেই সবচেয়ে বেশি ১২২টি বিমান হামলা চালানো হয়। এরপর সাগাইংয়ে ১০১টি এবং রাখাইনে ৯৮টি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, সামরিক বাহিনীর বিমান আধিপত্য মোকাবিলা করতে না পারা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মনোবল দুর্বল করে দিয়েছে।

তার মতে, বিমান হামলা শুধু পিডিএফ ও অন্যান্য প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হতাশ করছে না, বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী বেসামরিক জনগণকেও ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে।

তবু লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বিদ্রোহীদের

সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক বাহিনীর অগ্রগতি বাড়লেও প্রতিরোধ আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি বলে দাবি করছেন বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকেরা।

নির্বাসনে থাকা অধিকারকর্মী থিনজার শুনলেই ই বলেন, ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যেও বিরোধী নেটওয়ার্কগুলো সংগঠকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসমর্থন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

চিন ব্রাদারহুডের সালাই উইলিয়াম চিনও বলেছেন, বিমানশক্তি যুদ্ধের গতিপথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও এটি স্থায়ীভাবে যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করেনি। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের কৌশল পরিবর্তন ও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তার মতে, প্রতিরোধের সাফল্য শুধু কোনো শহর দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়। যেখানে সামরিক বাহিনীর বিমানশক্তির বড় সুবিধা রয়েছে, সেখানে মোবাইল যুদ্ধকৌশল বেশি কার্যকর হতে পারে। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেদের বাহিনীকে টিকিয়ে রাখা, বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *