সীমান্ত পেরিয়ে আলীকদমে আসছে মাদক, ঝুঁকিতে পাহাড়ের তরুণরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাদক পাচার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল ও সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন চোরাইপথ ব্যবহার করে ইয়াবা, আইস, বিদেশি মদ ও বিদেশি সিগারেটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।
দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে মাদক পাচারকারীরা এসব রুট ব্যবহার করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে সময়ে সময়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযানে মাদক পরিবহন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কুরুকপাতা ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও বিভিন্ন চোরাইপথ মাদক পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব এলাকায় পাহাড়, ঝিরি, বন ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নিয়মিত নজরদারি কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে মাদক পরিবহনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা-আফিমসহ বিভিন্ন মাদক
আলীকদম থানা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে মোট ২৭ হাজার ৮৯২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আটটি মামলা করা হয়েছে। মাদক বিক্রি, পরিবহন ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজন পাহাড়ি ও সাতজন বাঙালিকে আটক করা হয়।
চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময় পরিচালিত অভিযানের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের পৃথক অভিযানে এক হাজার ৬৩৫ পিস ইয়াবা, নয়টি আফিম ফল, ৬০০ গ্রাম আফিম ফলের বীজ এবং এক কেজি আফিমের শুকনা খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ২ দশমিক ৩৯০ গ্রাম গাঁজাসহ সাতজন পাহাড়ি ও আটজন বাঙালিকে আটক করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাদক পরিবহন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নারী-পুরুষ উভয়কেই আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, আলীকদমে মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রে ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৫৬, ৫৭ ও ৫৮ নম্বর সীমান্ত পিলারসংলগ্ন এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি ঝিরি, বন ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দুর্গম পথ ধরে এসব মাদক আলীকদমে আনা হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী মেনচং ম্রো কারবারীপাড়া, বড় বেতি, ছোট বেতি, বড় আগলা, ছোট আগলা, কাম্পুক পাড়া, ধরি ম্রো কারবারীপাড়া, ইয়াংরিং কারবারীপাড়া ও সিন্ধু-ইন্দু এলাকার আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন পাহাড়ি পথ তৈরির পাশাপাশি ঝিরিপথও মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের নজর এড়াতে কুরুকপাতা হয়ে তৈনখাল-দোছড়ি থেকে আলীকদমের আমতলী এলাকার পাহাড়ি পথ ব্যবহার করা হয় বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এ ছাড়া কুরুকপাতা-পোয়ামুহুরী সীমান্ত সড়ক হয়ে কালাইয়্যা ছড়া, নয়াপাড়া ইউনিয়নের বুচির মুখ ও মংচা পাড়া হয়ে কলার ঝিরির ভেতরের পথ দিয়ে মাদক পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। পরে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের আবাসিক এলাকার রাস্তা ব্যবহার করে লামা, ফাঁসিয়াখালী ও আলীকদমের প্রধান সড়কে ওঠার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব মাদক পাঠানো হচ্ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
তবে এসব নির্দিষ্ট রুটে নিয়মিত মাদক পরিবহনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
টাকার প্রলোভনে তরুণদের বাহক বানানোর অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা কাম্পুক ম্রো, মেনদন ম্রো ও লেংক্লাং মেম্বার অভিযোগ করেন, মাদক কারবারিরা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র ও বেকার তরুণদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মাদক পরিবহনে বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে কুরুকপাতা ইউনিয়নের ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কিছু তরুণকে ইয়াবা, গাঁজা ও আফিম পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অনেক সময় মাদক বহনকারী বা বাহকরা আটক হলেও মাদক কারবারের নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে নতুন করে তরুণদের একটি অংশ অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি মাদক পাচারের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন পুনর্বাসন
সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন বাসিন্দারা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করে মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। দুর্গম সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চোরাইপথগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, মাদক পরিবহনে জড়িয়ে পড়া তরুণদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো এবং মাদক কারবারের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান এবং মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা গেলে আলীকদমে মাদকের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জনপ্রতিনিধিরাও উদ্বিগ্ন
৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, দুর্গম সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার তরুণদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে মাদক কারবারিদের প্রলোভন থেকে তাঁদের দূরে রাখা সম্ভব হবে।
‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’
আলীকদম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন শাহ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে পুলিশ। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিশোরদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সেমিনার ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালানকারীদের গতিবিধির ওপরও নজর রাখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী সচেতনতা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সামাজিকভাবে তাঁদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করা গেলে আলীকদমে মাদকের বিস্তার রোধে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।