পানছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘর্ষে আতঙ্ক, গৃহহীন বহু পরিবার

পানছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘর্ষে আতঙ্ক, গৃহহীন বহু পরিবার

পানছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘর্ষে আতঙ্ক, গৃহহীন বহু পরিবার
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে উপজেলার জগপাড়া, তারাবন ও দুধুকছড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। পরদিন অর্থাৎ আজ (৪ সেপ্টেম্বর) ভোর থেকেও বিভিন্ন এলাকায় থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, আধিপত্য বিস্তার এবং অস্ত্র ও চলাচলের রুট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই পানছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। এতে উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বেড়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। গোলাগুলির আতঙ্কে অনেক পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। গৃহপালিত পশু নিয়েও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পানছড়ির বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে বিচ্ছিন্নভাবে সশস্ত্র সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এর ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের ওপরও। স্থানীয়দের দাবি, তারাবন ভাবনা কেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র অবস্থানের কারণে স্থানীয় দায়ক-দায়িকাদের একটি অংশ সেখানে যাতায়াত করতে পারছেন না।

ভাবনা কেন্দ্রে অবস্থানরত ভিক্ষু ও শ্রামণদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, খাদ্য ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে সেখানে অবস্থানরতদের কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

এদিকে এলাকায় ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায় স্থানীয়দের তথ্য আদান-প্রদানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেলেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত ভিক্ষু-শ্রামণদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

আদিকল্যাণ ভান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এলাকায় মানবশূন্য ও নীরব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট সাইবার গ্রুপগুলো থেকে বিভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে অনেক সময় হতাহত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয় না। ফলে সংঘর্ষে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হতাহত সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি এলাকায় জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের অবস্থান ও তৎপরতা বেড়েছে। আবার ইউপিডিএফও বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে।

দুই পক্ষই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে সশস্ত্র সদস্যদের পানছড়িতে এনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে উপজেলার বিভিন্ন পাড়ায় বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সশস্ত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ। সংঘর্ষের কারণে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও স্বাভাবিক যোগাযোগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি জাতিসত্তার কথিত অধিকার ও রাজনৈতিক দাবিকে সামনে রেখে এসব সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাকাণ্ড ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় পানছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ ও কৌশলগত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সেনা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নতুন ক্যাম্প স্থাপন, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সশস্ত্র সংঘাত বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে পানছড়িতে স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথও সুগম হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *