সাজেকে গোলাগুলির পর অবরোধের হুমকিতে পর্যটনশিল্পে ধসের শঙ্কা, জনভীতি কাজে লাগাচ্ছে ইউপিডিএফ

সাজেকে গোলাগুলির পর অবরোধের হুমকিতে পর্যটনশিল্পে ধসের শঙ্কা, জনভীতি কাজে লাগাচ্ছে ইউপিডিএফ

সাজেকে গোলাগুলির পর অবরোধের হুমকিতে পর্যটনশিল্পে ধসের শঙ্কা, জনভীতি কাজে লাগাচ্ছে ইউপিডিএফ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, মেঘে ঢাকা পাহাড় আর সবুজ উপত্যকার টানে প্রতিদিনই সাজেকে ছুটে যান দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ও আশপাশের এলাকায় থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনায় সেই পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় সাজেক থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকেরা। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি–সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক অবরোধের ঘোষণা নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। এতে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটক, আগাম বুকিং দেওয়া ভ্রমণপ্রত্যাশী এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক উপজাতিভিত্তিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন অপর সশস্ত্র গ্রুপ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত চলছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সাজেক এলাকায় দুই পক্ষের গোলাগুলিতে নয় বছর বয়সী এক ত্রিপুরা শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সাজেকের পর্যটন কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাজেকের উজোবাজার এলাকায় কথিত বিক্ষোভ ও মিছিল আয়োজন করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামে দুটি নামসর্বস্ব সংগঠন। ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের পক্ষ হতে কর্মসূচিতে অংশ নিতে সাধারণ পাহাড়িদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কর্মসূচিতে যোগ না দিলে মারধর ও জরিমানার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

সাজেকে জনসাধারণকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ইউপিডিএফের কর্মসূচি

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রধারীদের ভয় ও হুমকির কারণে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে অনেকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য হন। কর্মসূচিতে ব্যবহৃত ব্যানার-ফেস্টুন ইউপিডিএফের তৈরি ছিল। সেখানে সেনাবাহিনী, বাঙালি জনগোষ্ঠী ও প্রতিপক্ষ সংগঠনবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, কর্মসূচির ব্যানারের সামনে ইউপিডিএফের সংগঠক হিসেবে পরিচিত বাবু ধন চাকমাকে সক্রিয় দেখা গেছে। এ সময় সংগঠনটির আরও কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সূত্রের অভিযোগ, বাবু ধন চাকমা সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ে ইউপিডিএফের পক্ষে সক্রিয় রয়েছেন। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংগঠনটির সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি এসব কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইউপিডিএফের হয়ে চাঁদাবাজি এবং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনমত গঠনের অভিযোগও রয়েছে।।

স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, জনসমর্থন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে ইউপিডিএফ সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করছে। তাঁদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষের উপস্থিতিকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা হবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক স্বার্থে জনসাধারণকে সামনে ঠেলে দেওয়ার কৌশল। সাধারণ পাহাড়িদের নিরাপত্তা, জীবিকা ও মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে তাঁদের দিয়ে বিক্ষোভ-মিছিল করানো হলে তার দায়ও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয়, বৃহস্পতিবারের কর্মসূচির ৪৮ ঘণ্টা পর শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুর থেকে খাগড়াছড়ি–সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে ফিরে আসা এবং নতুন করে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের যাতায়াত নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিকে কেন্দ্র করে যাঁরা সাজেকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই মাঝপথে আটকে পড়া কিংবা নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারার আশঙ্কা করছেন।

পর্যটকদের কাছে সাজেক শুধু একটি ভ্রমণগন্তব্য নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটকবাহী জিপ-চাঁদের গাড়ি, স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র দোকান, খাবারের ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের আয় পর্যটকদের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক কমে গেলে বা যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে এসব খাতে একসঙ্গে আয়ের সংকট তৈরি হয়। বুকিং বাতিল, যানবাহন চলাচল কমে যাওয়া, কর্মীদের কাজ হারানো এবং স্থানীয় পণ্য ও খাবারের বিক্রি কমে যাওয়ার মতো প্রভাবও দেখা দিতে পারে।

আবারও সাজেক ভ্রমণে ‘মানা’

সাজেকের পর্যটন কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু বাঘাইছড়ি বা সাজেকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেক যাতায়াতের পরিবহন, আবাসন, খাবার ও অন্যান্য সেবা এবং রাঙামাটির পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরাও আস্থার সংকটে পড়তে পারেন। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ, চালক ও স্থানীয় সরবরাহকারীদের অনেকের বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে নিরাপত্তাহীনতা ও অবরোধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে তার আর্থিক চাপ ছড়িয়ে পড়তে পারে বিস্তৃত এলাকায়।

পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পর্যটন মৌসুমে এমন অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে সাজেকের প্রতি ভ্রমণপ্রত্যাশীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একবার পর্যটকেরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তাঁদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে। আগাম বুকিং বাতিল, কর্মীদের কাজ কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের লোকসানের পাশাপাশি সাজেকের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ইউপিডিএফের সুবিধাবাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, জেএসএসের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে চাপের মুখে পড়ে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান ধরে রাখতে ইউপিডিএফ বিভিন্ন নামে গঠিত সংগঠনকে সামনে রেখে কর্মসূচি চালাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসমর্থনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং পর্যটন চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেই।

সাজেকের পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় অনেক পরিবার পর্যটকদের কাছে খাবার বিক্রি, পরিবহনসেবা, গাইডের কাজ, আবাসন পরিচালনা কিংবা হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির মাধ্যমে আয় করে। নিরাপত্তাহীনতা ও অবরোধের কারণে পর্যটকেরা আসা বন্ধ করলে এসব পরিবারের আয় কমে যেতে পারে। ফলে সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক কর্মসূচির তাৎক্ষণিক প্রভাবের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার থাকলেও তা যেন সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা জীবিকা ও অর্থনীতির ক্ষতি করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, সশস্ত্র সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অবরোধের কারণে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা পর্যটকদের যাতায়াত ও জরুরি সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাজেকের সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রমে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। সশস্ত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি কিংবা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে সেই সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তাই পর্যটনশিল্পকে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র দ্বন্দ্বের বাইরে রেখে নিরাপদ যাতায়াত, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed