আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি, তবুও হামলা থামছে না কেন?

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি, তবুও হামলা থামছে না কেন?

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি, তবুও হামলা থামছে না কেন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, নৌবাহিনী অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং ইরানের আকাশে এখন সম্পূর্ণ আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের। রোববার ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। সোমবার বিকেলেও কাতার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করেছে। আবুধাবিতে একটি গাড়িতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনে একজন নিহত হয়েছেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো সক্ষমতা এতটা কমে গেলে ইরান এখন কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস হলেও ইরানের কাছে এখন স্বল্পপাল্লার রকেট, ছোট ড্রোন যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। এগুলো দিয়ে বড় আঘাত হানা না গেলেও আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব, যা ইরান এখন করছে।

ইরান কি এখন কম ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে?

সংখ্যার হিসাব বলছে, ইরানের হামলার সক্ষমতা সত্যিই মারাত্মকভাবে কমে এসেছে। যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতেই ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন ছুড়েছিল। অথচ ১৫তম দিনে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোনে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও একই চিত্র। প্রথম দুই দিনে প্রায় ১০০টি প্রজেক্টাইল ছোড়া হয়েছিল, সেখানে এখন তা একক অঙ্কে নেমে এসেছে।

সামগ্রিকভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমেছে ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা কমেছে ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ ইরানের বড় অস্ত্রভাণ্ডার এরই মধ্যে মূলত নিঃশেষ হয়ে গেছে বা ধ্বংস করা হয়েছে। তবে অল্প সংখ্যায় হলেও হামলা এখনও থামেনি।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কতটা শেষ হয়েছে?

২০২২ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ছিল ইরানের। ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, সংখ্যাটি ছিল প্রায় তিন হাজার। ২০২৫ সালের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের পর সেটি কমে ২ হাজার ৫০০-এ নেমে আসে।

মার্কিন-ইসরায়েল কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা। প্রতিটি উৎক্ষেপণ স্যাটেলাইট ও রাডারে ধরা পড়ায় লঞ্চারের অবস্থান চিহ্নিত করা সহজ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, আনুমানিক ৪১০ থেকে ৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে এরই মধ্যে ২৯০টি পর্যন্ত অকার্যকর করা হয়েছে।

তবে ইরান একটি বিশাল দেশ। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস বলছেন, মাটিতে সেনা না নামিয়ে ইরানের হামলার ক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তার মতে, ইরান আগে থেকেই অনেক ক্ষেপণাস্ত্র লুকানো জায়গায় বা সামরিক স্থাপনার বাইরে মোতায়েন করে রেখেছিল, যখন নজরদারি কম ছিল।

এখন ইরান সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বদলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোতে এক-দুটো করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। ডেস রোচেস বলছেন, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি মূলত ‘হয়রানিমূলক হামলা’ অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সতর্কব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।

ইরানের কৌশল কী?

ইরান জানে, সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হারানো সম্ভব নয়। তাই তেহরান বেছে নিয়েছে ভিন্ন পথ। অর্থাৎ শত্রুকে দুর্বল করা।

জার্মান ইনস্টিটিউটের গবেষক হামিদরেজা আজিজি বলছেন, ইরানের মূল হিসাব হলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার আগেই উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই প্রতিদিন কম কিন্তু নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তিনি বলছেন, ‘এটি সময়ের প্রতিযোগিতা’।

ইরান এখন মোবাইল লঞ্চারের ওপর বেশি নির্ভর করছে, যেগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ড বিকেন্দ্রীভূত করা হয়েছে, যাতে একটি জায়গায় আঘাত করলে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।

দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলছেন, কতটি ড্রোন ছোড়া হলো সেটি মুখ্য নয়। মুখ্য হলো হুমকিটা বিশ্বাসযোগ্য রাখা। ‘নিরাপত্তার অনুভূতি ভেঙে দিতে একটি সফল ড্রোনই যথেষ্ট’।

এখানে ইরানের বড় সুবিধা হলো শাহেদ-১৩৬ ড্রোন। এটি সস্তা, কম সময়ে তৈরি করা যায় এবং একসঙ্গে অনেকগুলো ছাড়লে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে সবগুলো ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। জটিল লঞ্চারের দরকার নেই বলে বিমান হামলায় এগুলো সহজে ধ্বংস করাও যায় না। এই কৌশলের প্রভাব ইতোমধ্যেই টের পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কাতার গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বাহরাইন তেল চালানে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ। হরমুজ প্রণালিতে শত শত জাহাজ আটকে আছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সামুদ্রিক ২০টি ঘটনার খবর মিলেছে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর সরাসরি বলছেন, ইরান যদি এভাবে তেলের দাম চড়িয়ে রাখতে পারে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সেই চাপ ইরানে মার্কিন বোমা হামলার ক্ষতির সমান বা তার চেয়েও বেশি।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।