ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন, মোদী-যোগী-শর্মাদের বিরুদ্ধে মার্কিন কমিশনে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতে মুসলিম, খ্রিস্টান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সংগঠিত ঘৃণা ও সহিংসতার ওপর নজর রাখা এক মার্কিন বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি বিস্তারিত রেকর্ড তুলে ধরেন এবং ক্ষমতাসীন দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভেদী ‘গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ)-এর সামনে শুনানিতে রাকিব হামিদ নায়েক তার সাক্ষ্যে ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়াতে বিজেপির উর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার কাজে বেসরকারি নির্মাণ সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টতা, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তার এবং বিদেশে সমালোচকদের লক্ষ্য করে ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ)-এর নির্বাহী পরিচালক নায়েক জানান, এই নিপীড়ন প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বাধীন দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুমোদনেই ঘটছে। এটি রাষ্ট্রযন্ত্র এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক (সংঘ পরিবার/আরএসএস ইকোসিস্টেম, বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ) দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি এই পদ্ধতিগত দমন-পীড়নকে “আমলাতন্ত্রে গেঁথে থাকা, আইনের মাধ্যমে সংহিতাবদ্ধ এবং সম্পূর্ণ দায়মুক্তির দ্বারা সুরক্ষিত” বলে বর্ণনা করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মার মতো বিজেপি নেতাদের এই নিপীড়নের উস্কানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ
নায়েক তার সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন যে, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তার উস্কানিমূলক মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত। তিনি ‘লাভ জিহাদ’ প্রচারণাকে সমর্থন করেন এবং তার অনুসারীরা মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণের মতো চরমপন্থী কথা বলে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে আদিত্যনাথ বলেছিলেন, “বাংলা মা কালীর দেশ, এটিকে কাবা (ইসলামের পবিত্র স্থান) হতে দেওয়া যাবে না।” সমালোচকরা এটিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা সম্পর্কে নায়েক বলেন, শর্মা বারবার মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক ভাষণ ও নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ভোটার বাদ দেওয়ার কথা বলেন এবং মুসলিমদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেন। ২০২৬ সালে তার দল একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিও শেয়ার করেছিল, যেখানে তাকে প্রতীকিভাবে মুসলিমদের লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা যায়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ২০১৪ সালে মোদী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। তারা বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ), ধর্মান্তর বিরোধী আইন এবং ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের প্রসঙ্গগুলোও টেনে আনেন।
গণহত্যার ঝুঁকি ও উচ্ছেদ অভিযান
নায়েক জানান, ‘ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’-এর আর্লি ওয়ার্নিং প্রজেক্ট অনুযায়ী, ১৬৮টি দেশের মধ্যে ভারত বর্তমানে গণহত্যার ঝুঁকির দিক থেকে চতুর্থ স্থানে রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আসামে কমপক্ষে ৩৩টি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যার ফলে প্রায় ২২,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ১ লক্ষ মানুষ (যাদের অধিকাংশ বাঙালি মুসলিম) বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ উচ্ছেদই হয়েছে ২০২৫ সালে।
২০২৫ সালের একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে তিনি জানান, ভারতের ২১টি রাজ্যে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ১,৩১৮টি ঘৃণামূলক ভাষণের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৯৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪টি করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও উচ্ছেদ অভিযান
নায়েক অভিযোগ করেন যে, বেআইনি উচ্ছেদ অভিযানে জেসিবি, ক্যাটারপিলার, টাটা, মাহিন্দ্র ও হুন্দাই-এর মতো বড় বড় কোম্পানির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি ইউএসসিআইআরএফ-কে এই সংস্থাগুলোর ভূমিকা তদন্ত করার সুপারিশ করেন।
গো-রক্ষা ও ধর্মীয় নিপীড়ন
গো-মাংস খাওয়া বা গবাদি পশু পরিবহনের অভিযোগে অন্তত ১৭টি রাজ্যে সক্রিয় ‘গো-রক্ষা দল’ মুসলিম ট্রাক চালকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। গত তিন বছরে এ ধরনের সহিংসতার ৪,০০০টিরও বেশি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়েছে।
খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়নের বিষয়ে তিনি জানান, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৫৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের বড়দিনের সময়কালেই ৬০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় দমন
নায়েক দাবি করেন যে, দেশের বাইরে থাকা সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে ভারত সরকার নানা পথ অবলম্বন করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তার মতো সমালোচকদের লক্ষ্য করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এমনকি এই শুনানির মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে ভারত সরকার এক্স (টুইটার) এর কাছে তার জিপিএস লোকেশন ডাটা চেয়েছিল।
সুপারিশমালা
রাকিব হামিদ নায়েক মার্কিন সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেন: সংশ্লিষ্ট ভারতীয় নেতা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ওপর গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য ভারতকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ (সিপিসি) হিসেবে ঘোষণা করা এবং সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির জন্য সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি নিষেধাজ্ঞা হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।