খামেনির জানাজায় কোরআনের আয়াতে বাংলাদেশকে বার্তা ইরানের
![]()
নিউজ ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে বিশ্ব রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সম্প্রতি তেহরানে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে এবং জানাজায় অংশ নিতে বিশ্বনেতা ও বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সমবেত হন। তবে এই আনুষ্ঠানিকতার মাঝে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে সেখানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের বিশেষ এক আয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জানাজায় উপস্থিত প্রতিটি দেশের প্রতিনিধিদের সামনে পৃথক পৃথক আয়াত তিলাওয়াত করা হয়েছে। এর পেছনে কেবল ধর্মীয় আবহ তৈরি করা নয়, বরং প্রতিটি দেশের জন্য লুকিয়ে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা।
বাংলাদেশ থেকে এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে অংশ নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি যখন খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন, তখন সেখানে তিলাওয়াত করা হয় সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত।
আয়াতের বাংলা অর্থ: ‘মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে তাদের কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কেউ কেউ (শাহাদাতবরণ করে) নিজেদের শপথ পূর্ণ করেছে, আর কেউ কেউ (শাহাদাতের) প্রতীক্ষায় আছে। এবং তারা তাদের অঙ্গীকারে সামান্যতমও পরিবর্তন করেনি।’
ইসলামিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই আয়াত নির্বাচনের পেছনে গভীর তাৎপর্য দেখছেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, উহুদের যুদ্ধের আগে বহু সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলেন যে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটবেন না এবং শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবেন। সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-সহ বেশ কয়েকজন সাহাবী শাহাদাতবরণের মাধ্যমে সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করেছিলেন।
বাংলাদেশকে এই আয়াত শোনানোর মাধ্যমে ইরান সম্ভবত ঢাকা-তেহরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা, কঠিন পরিস্থিতিতে আদর্শে অবিচল থাকা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের বার্তা দিতে চেয়েছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এমন সুনির্দিষ্ট বার্তা স্পষ্ট ছিল। যেমন- সৌদি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে বদর যুদ্ধের দুই বাহিনী সম্পর্কিত আয়াত (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩) তিলাওয়াত করা হয়, যা মূলত মুমিন ও কাফিরদের মুখোমুখি অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
আবার তুরস্কের প্রতিনিধিদের সামনে সূরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত পড়া হয়, যেখানে ঘরে ‘বসে থাকা’ মানুষের চেয়ে জান-মাল দিয়ে লড়াই করা সংগ্রামীদের শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে লেবাননের প্রতিনিধিদের সামনে তিলাওয়াত করা হয় ত্যাগের আহ্বান ও কৃপণতা সংক্রান্ত আয়াত।
একইভাবে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সান্ত্বনা ও সাহস জোগাতে সূরা আলে ইমরানের ১৩৯ নম্বর আয়াত শোনানো হয়- ‘তোমরা হীনবল হয়ো না, দুঃখিতও হয়ো না; তোমরাই শ্রেষ্ঠ, যদি তোমরা মুমিন হও।’
ইয়েমেনের হুথি প্রতিনিধিদের সামনে শক্তি ও অবিচলতার আয়াত (আলে ইমরান ৩:১৪৬) এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের প্রতিনিধিদের সামনে ক্ষমা ও অনুগ্রহের আয়াত (আলে ইমরান ৩:১৫২) তিলাওয়াত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনির এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠান কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। বরং প্রতিটি আয়াতের মাধ্যমে ইরান মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর অবস্থান, তাদের দায়িত্ব এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের স্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বার্তা পৌঁছে দিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।