সেনাবাহিনীর পুনর্বাসন উদ্যোগে বম সম্প্রদায়ের মাঝে আশার আলো, মাছের পোনা অবমুক্ত ও সৌরবিদ্যুৎ সহায়তা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রত্যাবর্তনকারী বম সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনে ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জীবিকা সৃষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যুৎ–সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে থানচি উপজেলার প্রত্যাবর্তনকারী বম সম্প্রদায়ের পাইনোয়ামপাড়ায় একটি পুকুর খনন, পাঁচ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম বিতরণ করেছে সেনাবাহিনী।
সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে খননকৃত পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে গ্রামের বিদ্যুৎ–সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের হাতে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, লাইটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হয়। গ্রামের কারবারি পারকেল বমের হাতে এসব উপকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা।
সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে বম সম্প্রদায়ের একটি বিপদগামী গ্রুপ সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) গঠনের পর পার্বত্যাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ২০২০ সালের এপ্রিলে থানচি-রুমা সীমান্তবর্তী বাকলাইপাড়া সেনা সাবজোনে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বম সম্প্রদায়ের সদস্য ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বম সোশ্যাল কাউন্সিলের সমন্বিত উদ্যোগে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে প্রায় ২১৫টি পরিবার দেশে ফিরে আসে। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর গত তিন বছর ধরে এসব পরিবারের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে নানামুখী জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়নের অধীন ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সার্বিক তত্ত্বাবধানে খনন করা পুকুরে রুই, সরপুঁটি, তেলাপিয়া ও নাইলোটিকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ হাজার মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।
মাছ চাষ সফলভাবে পরিচালনার জন্য উপকারভোগীদের মধ্যে মাছের খাদ্য (ফিড) এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও বিতরণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাড়তি আয়ের একটি টেকসই উৎস তৈরি করবে।

দুর্গম পাইনোয়ামপাড়ার অনেক পরিবার এখনও জাতীয় বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় বিদ্যুৎ–সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর মাঝে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, লাইটসহ প্রয়োজনীয় সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়।
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর ফলে শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হবে, রাতের নিরাপত্তা বাড়বে, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ হবে এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে।
অনুষ্ঠান শেষে বাকলাইপাড়া সাবজোন কমান্ডার মেজর আসিফ জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি দুর্গম অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং মানবিক সহায়তায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মাছ চাষের এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা বিদ্যুৎ–বঞ্চিত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও উন্নত করবে।
তিনি আরও বলেন, এই কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সেনাবাহিনী আশাবাদী।
উপকারভোগী পারকেল বম আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেন,”আমরা আর কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেব না। আমরা সবসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশে থাকব। সেনাবাহিনীর এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।”
স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, কারবারি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী বলে অভিহিত করেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন ও অনুন্নত অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে এমন টেকসই পুনর্বাসন কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর।
মাছের পোনা অবমুক্তকরণ ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম বিতরণ অনুষ্ঠানে বাকলাইপাড়া সাবজোনের সেনাসদস্য, স্থানীয় কারবারি, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে। প্রত্যাবর্তনকারী বম সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনে এই কর্মসূচি শুধু একটি মানবিক সহায়তা নয়, বরং তাদের আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।