মিয়ানমারের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভাবছে ভারত
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
মিয়ানমারের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভাবছে ভারত। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর সীমান্তের একটি অমীমাংসিত অংশের বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে দেশটি। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভূখণ্ড বিনিময়ের খবর সরাসরি নিশ্চিত করেনি নয়াদিল্লি।
সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, মণিপুর সীমান্তের একটি অমীমাংসিত অংশ চিহ্নিত করতে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্ভাব্য ভূমি বিনিময়ের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘সীমান্তের কিছু অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ওই অংশগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।’
মণিপুর সীমান্তে মিয়ানমারের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভারত বিবেচনা করছে—এমন প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ মন্তব্য করেন। তবে তিনি এ ধরনের প্রতিবেদন সরাসরি নিশ্চিত করেননি। কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট এক প্রতিবেদনে জানায়, নয়াদিল্লি এমন একটি প্রস্তাব সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
গত ১৭ জুলাই প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে একটি ‘সরকারি নথি’র বরাত দিয়ে বলা হয়, মণিপুর-মিয়ানমার সীমান্তের ৬৫ ও ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী অংশ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে প্রায় ১ দশমিক ৪ বর্গমাইল এলাকা বিনিময়ের একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ভারত সরকার। এ দুই সীমান্তস্তম্ভের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার।
প্রস্তাবিত এলাকা মণিপুরের চান্দেল জেলার সঙ্গে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কাবাও উপত্যকার সংযোগস্থলে অবস্থিত। চলতি বছরের ২৬ মে তারিখের ওই ‘সরকারি নথি’ অনুযায়ী, সীমান্ত নির্ধারণের কাজ তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ আগস্টের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চল ও চিন প্রদেশ পর্যন্ত এই সীমান্ত বিস্তৃত। পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেরা এ সীমান্তের বড় অংশই দুর্গম। এর দুই পাশে দীর্ঘদিন ধরে একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে আসছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের প্রায় ১ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার অংশ সীমান্তস্তম্ভের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে প্রায় ১৭১ কিলোমিটার অংশ এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। আর এর বেশিরভাগই অরুণাচল প্রদেশের লোহিত অঞ্চল এবং মণিপুরের কাবাও উপত্যকায়।
কেন ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভাবছে ভারত?
দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে, অমীমাংসিত সীমান্ত দ্রুত চিহ্নিত করে পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতে এ ভূখণ্ড বিনিময়ের কথা ভাবা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিদ্রোহীদের চলাচল এবং সীমান্তবর্তী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে চায় নয়াদিল্লি।
এর আগে ২০২৪ সালে ভারত ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পুরো ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে চালু থাকা ‘ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম’ বাতিলের সিদ্ধান্তও নেয়। এ ব্যবস্থার আওতায় সীমান্তবর্তী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সীমান্ত পাস ব্যবহার করে ভিসা ছাড়াই একে অপরের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারত।
বর্তমান ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত ১৯৬৭ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত হলেও কিছু অংশ এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। ২০১৮ সালে ভারত সরকার সংসদকে জানিয়েছিল, বাকি অংশগুলো দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হবে। এর মধ্যে নতুন করে ৯টি সীমান্তস্তম্ভ শনাক্ত ও স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
মণিপুরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬৪ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী মোলচাম এলাকা, ৭৫ থেকে ৭৯ নম্বর স্তম্ভের মধ্যবর্তী মোরেহ এলাকা এবং ৮৮ থেকে ৯৫ নম্বর স্তম্ভের মধ্যবর্তী চোরো খুনৌ এলাকা।
ভারত বরাবরই বলে আসছে, মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের কোনও বিস্তৃত সীমান্ত বিরোধ নেই। কেবল ৯টি সীমান্তস্তম্ভসংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় সমাধানের চেষ্টা চলছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট আরও জানিয়েছে, গত মাসে মিয়ানমারের নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষ ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী মোলচাম এলাকায় নতুন ও সহায়ক সীমান্তস্তম্ভ স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করেছে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া সীমান্তরেখা-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের নজির ভারতের আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৫ সালে ভারত ও বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন করে। এর আওতায় ভারত তার ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশকে দেয় এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল পায়। এর মাধ্যমে ৪১ বছরের সীমান্ত বিরোধের অবসান ঘটে।
এদিকে ভূখণ্ড বিনিময়ের সম্ভাব্য এ প্রস্তাবের বিরোধিতা শুরু হয়েছে মণিপুরে। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্য ইম্ফল টাইমস জানায়, মণিপুর ইন্টেগ্রিটি সমন্বয় কমিটি (কোকোমি) ভারত সরকারকে রাজ্যের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও মিয়ানমারকে না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেছে, এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে ব্যাপক জনআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
২০১৯ সালে নাগা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের শান্তি আলোচনার সময় গঠিত মেইতেই নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর এ জোট ২৭ জুলাই এক বিবৃতিতে বলে, ‘প্রতিবেদনের তথ্য সত্য হলে এবং এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে কোকোমি নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।’
সংগঠনটির দাবি, মণিপুরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না। তারা বলেছে, ১৯৪৯ সালে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই মণিপুর তার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের একটি অংশ হারিয়েছে। তাই রাজ্যের সীমানা আরও কমানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
কোকোমি আরও বলেছে, মণিপুরের জনগণের সম্মতি ছাড়া রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়াদিল্লির ‘আগুন নিয়ে খেলা’ উচিত হবে না।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।