মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, ১৯৪৭-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদ

মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, ১৯৪৭-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদ

মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, ১৯৪৭-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি স্মরণে ভারতের মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন করেছে বিভিন্ন চাকমা সংগঠন।

সোমবার (১৭ আগস্ট) দক্ষিণ মিজোরামের লংতলাই জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কামালানগরে চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (সিএডিসি) আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হলে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার (সিএনসিআই) মিজোরাম রাজ্য কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে সেন্ট্রাল ইয়াং চাকমা অ্যাসোসিয়েশন, সেন্ট্রাল মিজোরাম চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ও চাকমা মহিলা সমিতি সহযোগিতা করে।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশনের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত, যা র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড নামে পরিচিত, প্রকাশিত হয়। ওই সিদ্ধান্তে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে অঞ্চলটি বাংলাদেশের অংশ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত চাকমাসহ ওই অঞ্চলের অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। পরবর্তী সময়ে ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা ও নানা সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে।

সমাবেশে বক্তব্য দেন চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী সদস্য (সিইএম) ও সিএনসিআইয়ের জাতীয় সভাপতি ডি. জি. নিরুপম চাকমা। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সমসাময়িক বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। বিষয়টিকে শুধু মৌখিক ইতিহাস বা আবেগের বিষয় হিসেবে না দেখে ঐতিহাসিক দলিলের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, ১৯৪৭-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদ

১৯৪৭ সালের ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের কার্যবিবরণীর উল্লেখ করে নিরুপম চাকমা দাবি করেন, তৎকালীন ভারতীয় নেতা জওহরলাল নেহরু পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নেহরু ওই অঞ্চলকে তৎকালীন প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে বিশেষ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে এর জনসংখ্যার বড় অংশ বৌদ্ধ ও হিন্দু হওয়া এবং ভারতের সঙ্গে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশের দুই দিন আগে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭, রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর ওই পতাকা সরিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

নিরুপম চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বণ্টন শুধু তৎকালীন রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারণের ঘটনা ছিল না; এর প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর পড়েছে।

বক্তারা দেশভাগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিও তুলে ধরেন।

নিরুপম চাকমা বলেন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এসব ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর ভূমি, জীবিকা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মিজোরামে ১১তম ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, ১৯৪৭-এ পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানভুক্তির প্রতিবাদ

তবে ‘চাকমা কালো দিবস’ কোনো দেশ, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মূলত ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ ও অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করার দিন। একই সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে চাকমা তরুণদের মূল ঐতিহাসিক নথি ও দলিল অধ্যয়নের আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, নিজেদের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য জোরদার এবং নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।

অনুষ্ঠানে সিএডিসির চেয়ারম্যান কালী কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, সিএনসিআই মিজোরাম রাজ্য কমিটির সহসভাপতি অমরস্মৃতি চাকমা, সেন্ট্রাল ইয়াং চাকমা অ্যাসোসিয়েশনের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সন্তোষ চাকমা, চাকমা মহিলা সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইন্দু মতি দেওয়ান এবং সেন্ট্রাল মিজোরাম চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি পরবেশ চাকমাসহ সিএডিসির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও চাকমা সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরার পাশাপাশি চাকমা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ভারতের গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত সিএনসিআইয়ের জাতীয় সম্মেলনে প্রতি বছর ১৭ আগস্ট ‘চাকমা কালো দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে দিনটি পালন করে আসছে সংগঠনটি। এবার ছিল এর ১১তম আয়োজন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *